২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উদ্বেগ
২০২৬-এ প্রথম তিন মাসে সহিংসতায় ৩৬ নিহত, মানবাধিকার প্রতিবেদন

২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে সহিংসতায় ৩৬ জনের মৃত্যু, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬) সারাদেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত এবং চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৭০ জন এবং মব সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৪৯ জনের।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষের বিস্তারিত

এইচআরএসএস শনিবার (১১ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটি দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, নিজস্ব তথ্যসংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মার্চ সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন মাসে মোট ৬১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৬ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৪০৭৮ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের চারজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য দলের তিনজন রয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫৭৩টি (৯৪ শতাংশ) ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের সংঘর্ষে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৪ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৫৮৫ জন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২৬০টি ঘটনায় নিহত সাত ও আহত ১৬৫৪ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৩৬টি ঘটনায় নিহত তিন ও আহত ২১৯ জন। এছাড়া বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ২৩টি ঘটনায় ২০৪ জন এবং অন্যান্য দলগুলোর সংঘর্ষে ১৯৬ জন আহত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও অন্যান্য ঘটনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত তিন মাসে ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৫৭৩ জন। নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। নির্বাচন ঘিরে অন্তত ১২টি ঘটনায় ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার হন এবং ছয়জন আহত হন।

এ সময়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অন্তত ৭৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১৮৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ২১ হাজার ৭৪ জনকে। রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন কমপক্ষে ৮৫৮ জন নেতাকর্মী—এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৩৬ জন, বিএনপির ৩১৪ জন, জামায়াতের ৭৬ জন এবং এনসিপির ১৭ জন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নির্যাতন

গত তিন মাসে ১৭টি সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় আহত হন ২০৪ জন। এ সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫ এর অধীনে সাতটি মামলায় ৩৪ জনকে অভিযুক্ত এবং চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২টি হামলার ঘটনায় ১৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২২ জন, লাঞ্ছিত হয়েছেন ২০ জন এবং হুমকির মুখে পড়েছেন ২১ জন সাংবাদিক। দুই সাংবাদিককে আটক এবং আট সাংবাদিককে আসামি করে মামলা হয়েছে।

মব সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সীমান্ত পরিস্থিতি

দেশজুড়ে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৮৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলায় আহত হয়েছেন ৩১ জন। চারটি মন্দির, দুটি প্রতিমা এবং ১৯টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১৩টি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হয়েছেন ১৫ জন। মিয়ানমার সীমান্তে ১১টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত এবং ৩২ জন আটক হয়েছেন।

বিচারবহির্ভূত হত্যা, কারাগারে মৃত্যু ও শ্রমিক নির্যাতন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় তিন মাসে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৯ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে—এর মধ্যে ১৬ জন কয়েদি ও ২৩ জন হাজতি।

শ্রমিক নির্যাতনের ১৩৯টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩০ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৭৩ জন। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতায় আরও ৭২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৭০ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৪৭ জন, যাদের ৫২ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে নয়জনকে। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৬ নারী। শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৮ জন; এর মধ্যে ১৩৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

এইচআরএসএসের উদ্বেগ ও সুপারিশ

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানায় এইচআরএসএস।