ইসরায়েলের নেসেট পাস করল ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে বিতর্কিত মৃত্যুদণ্ড আইন
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট সোমবার (৩০ মার্চ) ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত মৃত্যুদণ্ড আইন পাস করেছে, যা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। এই নতুন আইন অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক আদালতে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াকে একটি স্বাভাবিক বা ‘ডিফল্ট’ সাজা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এই দণ্ড কার্যকর হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যমূলক আইনি ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনি আইনি কেন্দ্র ‘আদালাহ’-এর আইনি পরিচালক সুহাদ বিশারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই আইনটি মূলত এমন ব্যক্তিদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার লাইসেন্স দিচ্ছে যারা কোনো ধরনের হুমকি নয়। বিশারা আরও যোগ করেন, এই আইনটি কেবল ফিলিস্তিনিদের টার্গেট করে তৈরি করা হয়েছে, যা মৌলিক সাম্য এবং জাতিগত বৈষম্যবিরোধী নীতির চরম লঙ্ঘন। আদালাহ ইতিমধ্যে এই আইনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার পরিকল্পনা করছে।
এছাড়া ইসরায়েলের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল’ সোমবার এই আইনের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন দাখিল করেছে। তাদের মতে, পশ্চিম তীরের ওপর কোনো আইন প্রণয়ন করার এখতিয়ার নেসেটের নেই, কারণ সেখানে ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। এছাড়া এই আইনটি জীবন রক্ষার অধিকার, মানুষের মর্যাদা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মৌলিক ধারাগুলোকে লঙ্ঘন করে, যা ইসরায়েলের নিজস্ব মৌলিক আইনেরও পরিপন্থী।
আইনের বিধান ও সমালোচনা
এই নতুন আইনের ফলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে এক ধরনের গোপনীয়তা বা ‘ব্ল্যাকআউট’ বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে। আইনটি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখার কঠোর বিধান আরোপ করেছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদেরই কেবল এই সাজা দেওয়া হবে, যা প্রকারান্তরে একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ইসরায়েলিদের এই কঠিন দণ্ড থেকে অব্যাহতি দেয়। সমালোচকরা মনে করছেন, এটি ইসরায়েলি বিচার ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ দ্বিচারিতা এবং বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর একটি অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দখলদার শক্তি অধিকৃত ভূখণ্ডে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নেসেটের এই পদক্ষেপ আসলে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার একটি অলিখিত বা ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রচেষ্টা। সুহাদ বিশারা তাঁর বিবৃতিতে পরিষ্কার করেছেন যে, অধিকৃত জনসংখ্যার ওপর নেসেটের আইন প্রণয়নের কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা নেই এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি প্রকাশ্য লঙ্ঘন।



