ভূমধ্যসাগরে ১২ তরুণের মৃত্যু: সুনামগঞ্জে মানব পাচার দালালদের বিরুদ্ধে মামলা
ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলা পুলিশ দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় মোট ৯ জন দালালের বিরুদ্ধে মানব পাচার অপরাধ দমন আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে এই মামলাগুলো করা হয়, যা মানব পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রতিফলন।
মামলার বিবরণ ও বাদীদের পরিচয়
দিরাই থানায় করা মামলার বাদী হয়েছেন ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমানের পিতা ছালিকুর রহমান। অন্যদিকে, জগন্নাথপুর থানায় করা মামলার বাদী হয়েছেন পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমান, যার পুত্র আমিনুর রহমান একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই মামলাগুলো মানব পাচারের শিকার পরিবারগুলোর আইনি লড়াইয়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশের তদন্ত ও অভিযান
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার আজ মঙ্গলবার সকালে প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, ‘আমরা এ মুহূর্তে আসামিদের নাম প্রকাশ করছি না। তবে আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় দালাল চক্রের তদন্ত চলছে এবং দ্রুত গ্রেপ্তার আশা করা যাচ্ছে।
দুর্ঘটনার করুণ বিবরণ
লিবিয়া থেকে ছোট রাবারের বোটে করে সম্প্রতি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের করুণ মৃত্যু হয়। ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ৪৮ জনকে নিয়ে ওই বোট গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। সাগরে প্রথমে নৌযানটির জ্বালানি শেষ হয়ে যায় এবং পরে পথ হারিয়ে বোটটি ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। এই সময় পানিশূন্যতা ও অনাহারে অনেকে মারা যান, যার মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জন রয়েছেন। দুই দিন লাশগুলো বোটে রাখার পর সঙ্গীরা সাগরে ভাসিয়ে দেন। ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে ভাসতে থাকা বোট থেকে ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করে সে দেশের কোস্টগার্ড।
দালাল চক্রের কার্যক্রম ও আর্থিক ক্ষতি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রিসে যেতে এসব ব্যক্তি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়েছেন। অনেকে গরু, জমিজমা বিক্রি করে এই বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছেন। অবৈধ পথে ইউরোপে নিতে সুনামগঞ্জ জেলায় একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের সহযোগীরা লিবিয়ায় অবস্থান করছে। এই চক্র দরিদ্র পরিবারগুলোর স্বপ্নকে পুঁজি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করছে।
জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় ইউএনওরা দালালদের তালিকা করে সেটি পুলিশকে দিয়েছেন। সব উপজেলাতেই খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে আমরা আছি।’ তিনি আরও জানান, মানব পাচার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৃতদের স্থানীয় বণ্টন
মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের ১২ জনের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন রয়েছেন। এই ঘটনা জেলাবাসীকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে এবং মানব পাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।



