মানব পাচারের মৃত্যুফাঁদে বাংলাদেশি তরুণ: আইনের দুর্বলতা ও বেড়ে চলা সংকট
মানব পাচারে বাংলাদেশি তরুণ: আইনের দুর্বলতা ও সংকট

মানব পাচারের মৃত্যুফাঁদে বাংলাদেশি তরুণ: আইনের দুর্বলতা ও বেড়ে চলা সংকট

সত্তরোর্ধ্ব আবদুল গণি তাঁর ছেলে সাজিদুর রহমানকে গ্রিসে পাঠাতে নিজের সহায়-সম্বল বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু সেই ছেলে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারালেন। এখন মুঠোফোনে ছেলের ছবি দেখে কাঁদেন এই বাবা। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের এই করুণ গল্প মানব পাচারের নির্মম বাস্তবতার একটি মাত্র উদাহরণ।

দালালের ফাঁদে পড়া তরুণদের করুণ পরিণতি

পটুয়াখালীর দেলোয়ার হোসেনের মা সুফিয়া বলেন, ‘সমিতি ও পরিচিতদের থেকে সুদে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে পোলারে বিদেশ পাঠিয়েছি। পোলা বিপদে পড়ছে। লোনের টাকাও দিতে পারতেছি না।’ দেলোয়ারকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, সেখানে তিনি কারাগারে বন্দি হন। বহুদিন পর দেশে ফিরলেও ঋণের বোঝা নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

কাজের খোঁজে বিদেশে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি তরুণেরা দালালদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। দালালেরা তাঁদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছেন অনাহারে মৃত্যুর মুখে। কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে পৌঁছাতে পারলেও বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কারাগারে অমানবিক অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অপহরণ, নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় ও জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনের দুর্বলতা ও শাস্তিহীনতা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের পাঁচ বছরের (২০২০-২৪) ৪ হাজার ৪২৭ মামলার পরিসংখ্যান বলছে, এসব মামলার ৯৪-৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। অর্থাৎ কঠোর শাস্তির হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাচারকারীরা কম শাস্তি বা সাজা না হওয়ায় এই অপরাধে উৎসাহিত হন, যেখান থেকে তারা বড় আয় করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচারবিরোধী ইউনিটের হিসাবও একই চিত্র তুলে ধরে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কার ৫৩৬টি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৭ জনকে; কিন্তু গ্রেপ্তার করা গেছে মাত্র ৩৫৩ জনকে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার আন্তরাষ্ট্রীয় অপরাধ হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না।

পাচারের জটিল রুট ও হটস্পট জেলা

মানব পাচারকারীরা আকাশপথ, সমুদ্রপথ ও স্থলপথ—এ তিন পথেই তাদের অপকর্ম চালাচ্ছে। ইতালিতে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে নেপাল, ভারত বা শ্রীলঙ্কা হয়ে দুবাই, তারপর মিসর বা তিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে রাখা হয় তরুণদের। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পাঠানো হয়। সিআইডির তথ্য বলছে, গত এক বছরে এভাবে ১৭ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ইতালি পাঠানো হয়েছে।

সিআইডির বিশ্লেষণে দেশের সাতটি জেলা মানব পাচারের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেগুলো হলো মাদারীপুর, শরীয়তপুর, যশোর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট ও ফরিদপুর। এ জেলাগুলোতে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ায় পাচারকারীরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সহজেই ভুক্তভোগী সংগ্রহ করে।

লিবিয়া: মৃত্যুফাঁদে পরিণত

লিবিয়া এখন বাংলাদেশিদের জন্য মানব পাচারের সবচেয়ে বিপজ্জনক গন্তব্যগুলোর একটি। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে লিবিয়া থেকে মোট ৬ হাজার ২৬০ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলছে, পাচারের প্রবণতা কমার বদলে বরং বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছেন ৫৫৯ জন। গত বছরের একই সময়ে ভূমধ্যসাগরে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৮৭। ব্র্যাকের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, লিবিয়ায় বন্দী বাংলাদেশিদের ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

পাচারের ধরন বদলাচ্ছে

প্রতিনিয়তই মানব পাচারের অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। কেবল ভালো চাকরি ও উচ্চ আয়ের প্রলোভনই নয়, বিদেশে পড়াশোনা ও বিয়ের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েও মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে। সিআইডির তথ্য বলছে, গত বছর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চীনে মানব পাচারের ঘটনায় দুই চীনা নাগরিকসহ মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর নির্বাহী পরিচালক তানসিম সিদ্দিকী বলেন, মানব পাচারের রুট এখন বহুমাত্রিক ও বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একটি দেশের চক্রের সঙ্গে অন্য দেশের চক্রের সরাসরি সংযোগ থাকে না। ফলে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া এই নেটওয়ার্ক দমন করা কঠিন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র যদি কঠোর অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে, তবে অন্তত দেশের ভেতর থেকে মানব পাচার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।