চাঁদপুরের খামারে শ্রমিক হত্যা: বেতন ও কাজ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে পিটিয়ে মৃত্যু
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় একটি গরুর খামার থেকে শ্রমিক মঞ্জিল শেখ ওরফে মঞ্জু শেখের (৬০) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। নিহতের স্বজনদের দাবি, সহশ্রমিক ও খামার মালিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও কাজের দ্বন্দ্বের জেরে গত শনিবার রাতে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
নিহত মঞ্জিল শেখের বাড়ি মতলব দক্ষিণ উপজেলার বাড়ৈগাঁও গ্রামে। তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছেন, যাদের মধ্যে দুই ছেলে বিদেশে বসবাস করেন। পরিবারে দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় ‘এমএসপি অ্যাগ্রো’ নামের গরুর খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশ, স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের বরাতে জানা যায়, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে মঞ্জিল শেখ এই খামারে কাজ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে খামারে আরেক শ্রমিক মো. সাগরও কর্মরত ছিলেন, যার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। খামারের মালিক সেলিম প্রধান, আর দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর ভাই ইয়াকুব প্রধান।
দ্বন্দ্ব ও হত্যাকাণ্ডের পটভূমি
সূত্রমতে, খামারের কাজ ও বেতনবৃদ্ধি নিয়ে প্রায়ই মঞ্জিল শেখের সঙ্গে ইয়াকুব প্রধানের বিবাদ লেগে থাকত। এছাড়া সহশ্রমিক মো. সাগরের সঙ্গেও নানা বিষয়ে তাঁর ঝগড়া হতো। গত শনিবার রাতে কাজ ও বেতনবৃদ্ধি নিয়ে মঞ্জিল শেখের সঙ্গে ইয়াকুব প্রধান ও মো. সাগরের তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়।
আজ সকাল সাড়ে ১০টায় ইয়াকুব প্রধান মঞ্জিল শেখের ছোট মেয়ে মুক্তা আক্তারকে খবর দিয়ে খামারে ডেকে আনেন। মুক্তা আক্তার ও অন্যান্য স্বজন সেখানে পৌঁছে দেখতে পান, মঞ্জিল শেখের রক্তাক্ত লাশ খামারের ভেতরে একটি পাতানো বিছানায় পড়ে আছে। তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত ও রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন রয়েছে। লাশের পাশে একটি রক্তমাখা মোটা ও ভারী রড পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসময় সহশ্রমিক মো. সাগর সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন।
পুলিশের তদন্ত ও স্বজনদের প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে বেলা ১১টায় তারা লাশ উদ্ধার করে। চাঁদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মতলব সার্কেল) জাবির হুসনাইন সানীবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
আহাজারি করতে করতে মঞ্জিল শেখের মেয়ে মুক্তা আক্তার বলেন, ‘বাবার সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সর্বশেষ আমার ফোনে কথা হয়েছিল। গতকাল রাতে ফোন করে বাবাকে পাইনি। বেতন কম দেওয়া এবং বেশি কাজ করানোসহ নানা বিষয় নিয়ে আমার বাবার সঙ্গে ইয়াকুব প্রধান ও মো. সাগরের বিবাদ ছিল। তারা দুজনে মিলে আমার বাবাকে খুন করেছে। বাবা হত্যার বিচার চাই আমি। থানায় মামলা করছি। আমার বাবা কী দোষ করেছিল? তাঁকে কেন খুন করল? বাবা ছাড়া কীভাবে বাঁচব!’
খামারের দেখভালকারী ইয়াকুব প্রধান ও সহশ্রমিক মো. সাগরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ধরেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মো. সাগর ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ
এ বিষয়ে মতলব দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ব্যক্তিগত ও খামারের কাজের দ্বন্দ্বের জেরে লোহার রড দিয়ে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ ময়নাতদন্তের জন্য নিহতের লাশ চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যেখানে নিহতের ছোট মেয়ে মুক্তা আক্তার বাদী হিসেবে মামলাটি করছেন।
এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় সম্প্রদায়ে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া ফেলেছে, এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে স্বজনদের আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



