ফেসবুক পোস্টের জন্য অপহরণ: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীর মর্মস্পর্শী জবানবন্দি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সোমবার চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন ভুক্তভোগী ইকবাল চৌধুরী। তাঁর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনামূলক ফেসবুক পোস্টের কারণে ২০১৮ সালের ৭ মে রাতে তাঁকে বাসা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল।
অপহরণের বিস্তারিত বিবরণ
ইকবাল চৌধুরী জবানবন্দিতে বলেন, তিনি বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে বের করে দেওয়া এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৮ সালের ৭ মে রাতে সাত–আটজন ব্যক্তি তাঁর বাসায় হানা দেয়।
ওই ব্যক্তিরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁকে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে ওঠানোর সময় ডিবির পোশাক পরা দুজনকে দেখতে পান তিনি। গাড়িতে ওঠার পর তাঁর চোখ বাঁধা হয়, হাতকড়া পরানো হয় এবং যমটুপি দেওয়া হয়।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নির্যাতন
গাড়ি চলার সময় একজন তাঁকে বলেন, যা জিজ্ঞাসা করা হবে সত্য বলতে হবে, নয়তো ‘ক্রসফায়ার’ করে লাশ গুম করে ফেলা হবে। গাড়িটি ২০ থেকে ৩০ মিনিট চলে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর রক্তচাপ মাপা হয় এবং পরে একটি কক্ষে রাখা হয়।
ইকবাল চৌধুরী বর্ণনা করেন, তাঁকে ৮ থেকে ১০ ফুটের একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল, যেখানে ছোট একটি চৌকি ছিল। কক্ষটিতে একটি লাইট ২৪ ঘণ্টা জ্বলত এবং সামনের দেয়ালে বড় একটি এগজোস্ট ফ্যান ছিল, যা প্রচণ্ড শব্দ করত। তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হতো আমি একটি জীবন্ত কবরে আছি।”
মামলার আসামি ও বিচার প্রক্রিয়া
এ মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পাঁচজন মহাপরিচালক, ছয়জন সাবেক পরিচালকসহ মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন, বাকি ১০ জন পলাতক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই মামলার বিচার করছে। জবানবন্দির সময় সাক্ষী আবেগতাড়িত হয়ে পড়ায় ট্রাইব্যুনাল আগামী বৃহস্পতিবার আবার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে।
অন্যান্য মামলার হালনাগাদ
একই দিনে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মো. আবু সায়েদ বিন মাহিন সরকার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় হুমকির মুখোমুখি হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনাল-১–এ সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করা হয়েছে। আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য ১১ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে।
এই মামলাগুলো বাংলাদেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।



