তোফায়েল আহমেদ: উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অমর নায়ক
তোফায়েল আহমেদ: উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক

তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন, একাধিকবার আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন, বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক।

গণ-অভ্যুত্থানের যৌথ নেতৃত্ব

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক সংগঠন বা নেতৃত্বে হয়নি, হয়েছিল যৌথ নেতৃত্বে। সে সময়ের ডাকসু, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুই গ্রুপ ও এনএসএফ থেকে বেরিয়ে আসা একটি গ্রুপ মিলে গঠিত হয়েছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাদের মূলমন্ত্র ছিল ১১ দফা, যাতে ছাত্রদের ন্যায্য দাবির পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষকসহ গণমানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ পেয়েছিল। এই ১১ দফায় জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা ছিল। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের পর আর সেটি কাজ করেনি; প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন

প্রতিটি ছাত্রসংগঠনের দুজন করে নেতার পাশাপাশি ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরীকে নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্রলীগ থেকে ছিলেন আবদুর রউফ ও খালেদ মোহাম্মদ আলী, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) থেকে সাইফউদ্দিন আহমদ ও মো. শামসুদ্দোহা, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) থেকে মাহবুবউল্লাহ ও মোস্তফা জামাল হায়দার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে ক্যাম্পাসের সব সমাবেশে তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করতেন, ফলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও তিনিই হয়ে ওঠেন আন্দোলনের মধ্যমণি। ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন প্রথমে ক্যাম্পাসেই সীমিত ছিল। কিন্তু সরকারি বাহিনী যখন গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল দিয়ে আন্দোলন দমন করতে চাইল, তখনই তা ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে পুরো শহর এবং একপর্যায়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণবিস্ফোরণ ও তোফায়েলের ভূমিকা

ছাত্র আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নেয় ২০ জানুয়ারি, যখন পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ মারা যান। কারফিউ ও গুলি অগ্রাহ্য করে ছাত্র–জনতা শহরে নেমে আসেন। ২৪ জানুয়ারি নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানসহ কয়েকজন নিহত হলে পুরো দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মতিউরের লাশ সামনে রেখে ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা করেন, 'মতিউরের বাবাকে কথা দিলাম, আইয়ুবের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না।' সেখানে উপস্থিত শহীদ মতিউরের বাবা আজহার আলী মল্লিক ঘোষণা করেন, 'আমি এক মতিউরকে হারিয়ে লক্ষ মতিউরকে পেয়েছি।'

সেদিন গণবিদ্রোহে পুরো শহর প্রকম্পিত হয়েছিল, বিক্ষুব্ধ জনতার রোষ থেকে রেহাই পায়নি মন্ত্রীদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারপতিকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে তোফায়েল

উনসত্তরের আন্দোলন যৌথ নেতৃত্বে সংগঠিত হলেও ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে তোফায়েল আহমেদের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ইকবাল হলে তাঁর ৩০৩ কক্ষটি হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্র। রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই, বাঙালি আমলা-ব্যবসায়ীরাও সেখানে এসে সংহতি জানিয়েছেন এবং সাধ্যমতো সহায়তা করেছেন।

তোফায়েল আন্দোলন-তরঙ্গের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ২৩ ফেব্রুয়ারি, যেদিন আওয়ামী লীগ নেতা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি শেখ মুজিবুর রহমানকে রেসকোর্সে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেদিন লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তোফায়েল তাঁকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

পরবর্তী রাজনীতি ও তোফায়েলের অবস্থান

যেই ছাত্রনেতৃত্ব একত্র হয়ে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত করেছিল, পরবর্তীকালে তাঁরা রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে এক থাকতে পারেননি। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের একাংশ নির্বাচন বর্জন করে বিপ্লবের খোয়াব দেখল, আরেক অংশ জাতীয়বাদীদের সঙ্গে ঐক্য করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অবস্থান ধরে রাখতে পারল না। ফলে আওয়ামী লীগ একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের পেছনে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং এর অন্যতম নেতা তোফায়েল আহমেদের অবদান কম নয়।

তোফায়েল আহমেদের জীবনের মহত্তম অর্জন উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন এবং সহযাত্রীদের অবদানের কথাও বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে তোফায়েল আহমেদ উনসত্তরের স্মৃতি আঁকড়ে ছিলেন মৃত্যুর আগপর্যন্ত।

ব্যক্তিগত গুণাবলি ও দ্বিচারিতার অভাব

আমাদের রাজনীতিকদের অনেকেই ক্ষমতায় গিয়ে এমন বৃত্ত তৈরি করেন যে কাছে ঘেঁষা যায় না। আবার ক্ষমতার বাইরে থাকতে গণমুখী হয়ে ওঠেন। তোফায়েল আহমেদের মধ্যে এই দ্বিচারিতা লক্ষ করিনি। কোনো লেখা ভালো লাগলে তিনি টেলিফোন করতেন বা মেসেজ পাঠিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতেন। আবার সেই বার্তার জবাব না দিলে মৃদু তিরস্কারও করতেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে একবার তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে সচিবালয়ে গিয়েছিলাম। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের পর তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করে পূর্বসূরি এক ছাত্রনেতার নাম করে বলেছিলেন, 'আজ যে আমি তোফায়েল হয়েছি, এর পেছনে অনেক মানুষের অবদান আছে। আজ আমি তাদের কথা ভুলি কী করে?' পরে জেনেছি, সেই সাবেক ছাত্রনেতার চিকিৎসার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তাও করেছিলেন। ষাট ও সত্তরের রাজনীতিকদের মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধ ও বিবাদ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ঔদার্য ও সহমর্মিতা ছিল, যা নব্বই–পরবর্তী রাজনীতিতে অনেকটাই অপসৃত।

দোষ-গুণের মূল্যায়ন ও চিরস্থায়ী পরিচয়

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আমরা অনেক কৃতী মানুষের দেখা পেয়েছি। দোষ–গুণ মিলিয়েই তাঁদের জীবন ও কর্মকে মূল্যায়ন করতে হবে। তোফায়েল আহমেদ যেই দল করতেন, সেই দলের অনেক অর্জন যেমন আছে, তেমনি আছে অনেক ভ্রান্তিও। বিরোধী দলে থাকতে তিনি জেল–জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর দল ক্ষমতায় থাকতে অন্য দলের নেতা-কর্মীরা যখন অনুরূপ ফল ভোগ করেছেন, ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা ও সহমর্মিতা দিয়ে তা ঠেকাতে পারেননি। এই আক্ষেপ কখনো কখনো প্রকাশও করেছেন।

প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যেও তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেননি। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী মনে করতেন। কর্মী হিসেবেই বিদায় নিলেন। তিনি ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন উনসত্তরের তোফায়েল হিসেবেই। আরও অনেকের মতো তাঁর বিদায়েও আমরা যথাযথ সম্মান জানাতে পারিনি, এটাই আমাদের রাজনীতির ট্র্যাজেডি।