বসুন্ধরায় গৃহকর্মী নির্যাতন মামলায় অভিযোগ গঠন, আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১৩ বছর বয়সী গৃহকর্মী কল্পনাকে নির্যাতনের ঘটনায় বাসার মালিক দুই ভাই-বোনের বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন করেছেন। রবিবার (১ মার্চ) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক শাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া এই আদেশ দেন, যা মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার কাজের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত। আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বিবরণ ও আসামিদের পরিচয়
মামলার দুই আসামি হলেন বাসার মালিক দিনাত জাহান আদর এবং তার ভাই নাজমুস সাকিব। আদালতের বেঞ্চ সহকারী ইব্রাহিম কাউছার জানান, আগামী ২৫ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে, যা বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ১ জুন থেকে বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায় দিনাত জাহানের বাসায় কাজে যোগ দেয় কল্পনা, এবং ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাকে কোনো দিনই ঠিকমত খেতে দেওয়া হয়নি।
নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ
অভিযোগে বলা হয়, দিনাত ও তার ভাই কারণে-অকারণে কল্পনাকে মারধর করতেন, চুল শুকানো ড্রায়ার দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন, এবং কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে তার হাতের নখ উঠিয়ে ফেলা হয়। জুতার ব্রাশ দিয়ে মেরে পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়, এবং ঘর মোছার ব্রাশ দিয়ে মুখে বাড়ি দেওয়ায় কল্পনার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে যায়। মারধরের ফলে মুখ, হাত-পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থানে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, এবং সেই গন্ধ দূর করতে পারফিউম ব্যবহার করা হলেও তাকে ওষুধ দেওয়া হত না। ক্রমাগত নির্যাতনে কল্পনার চেহারা বিকৃত হয়ে যায়, যা ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটর ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আফনান সুমীর কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আপসনামা ও আদালতের সিদ্ধান্ত
মামলার তদন্ত চলাকালীন গত বছরের ১৬ জুলাই উভয় পক্ষ অর্থের বিনিময়ে একটি আপসনামা আদালতে দাখিল করে, যেখানে দাবি করা হয় ভুল বোঝাবুঝির কারণে মামলাটি হয়েছিল। তবে আদালত আজ সেই আবেদন আমলে না নিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে একটি স্পষ্ট পদক্ষেপ। আসামিপক্ষের আইনজীবী মহিমা বাঁধন বলেন, আসামি পক্ষ ভিকটিমের সব দায়িত্ব নিয়েছে, তার ভরণপোষণ, বিয়ে, দোকান করে দেওয়া এবং নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ট্রায়াল ফেসে সব মিলিয়ে তারা খালাস পাবেন।
পটভূমি ও আইনি পদক্ষেপ
উল্লেখ্য, নির্যাতনের শিকার কল্পনা এর আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তার ওপর হওয়া নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছিলেন। গত বছরের ২৮ আগস্ট ভাটারা থানার এসআই মো. নেছার উদ্দিন দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন, যা এই মামলার আইনি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। এই ঘটনা শিশু ও গৃহকর্মী অধিকার সংরক্ষণে সমাজের সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে।
