ভারতের ঝাড়খণ্ডে 'ডাইনি' অপবাদে মা ও শিশুকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা: গ্রেপ্তার ৪
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে 'ডাইনি' অপবাদের শিকার হয়ে এক নারী ও তার ১০ মাস বয়সী শিশুকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এই মধ্যযুগীয় কায়দায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে পুলিশ এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের সন্ধানে তদন্ত চালাচ্ছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের কুদসাই গ্রামে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহত নারীর নাম জ্যোতি সিনকু। এই হামলায় জ্যোতির স্বামী কোলহান সিনকুও গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই গ্রামে বেশ কিছু গবাদি পশুর আকস্মিক মৃত্যু এবং পুসতুন বিরুয়া নামে এক স্থানীয় ব্যক্তির অসুস্থতা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসী জ্যোতি সিনকুকে 'ডাইনি' হিসেবে সন্দেহ করতে থাকে এবং তাকেই এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দায়ী মনে করে।
হামলার ভয়াবহতা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুসতুন বিরুয়া মারা যাওয়ার পর একদল উত্তেজিত জনতা জ্যোতির বাড়িতে হামলা চালায়। কোলহান সিনকু জানান, প্রায় ডজনখানেক লোক তাদের বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রী ও সন্তানকে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি গ্রাম পঞ্চায়েতে বিষয়টি মীমাংসার জন্য আকুতি জানালেও আক্রমণকারীরা কোনো কথা শোনেনি। জেলা পুলিশ কোলহানের জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে।
ভারতে ডাইনি অপবাদের ইতিহাস
ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশটিতে কেবল ডাইনি অপবাদে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী। ঝাড়খণ্ড ও বিহারের মতো এলাকাগুলোতে যেখানে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায়নি এবং শিক্ষার অভাব রয়েছে, সেখানে এখনো ওঝা ও কবিরাজদের ওপর মানুষের নির্ভরতা এবং কুসংস্কারের কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রায়ই ঘটে চলেছে।
পুলিশের পদক্ষেপ
এই ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছে, তারা গ্রামীণ এলাকায় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করবে। পুলিশের এই উদ্যোগকে স্থানীয়ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধে সহায়ক হতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ড ভারতের গ্রামীণ সমাজে এখনও বিদ্যমান কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা আধুনিক যুগেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
