ট্রাম্পের কূটনীতি: বিশ্বাস ভেঙে পারমাণবিক অস্থিরতার ঝুঁকি
নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার ওপর সীমা শুধু উঠেই যায়নি, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও তথ্যভিত্তিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। পূর্বে উভয় দেশ একে অপরের স্থাপনা পরিদর্শন করত, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিময় করত এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরানো বা পরীক্ষার আগে পরস্পরকে জানাত। এসব প্রক্রিয়া তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও স্থিতিশীলতা গড়ে তুলেছিল।
ট্রাম্পের পর্বভিত্তিক কূটনৈতিক দর্শন
এই ভাঙনের পেছনে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বতন্ত্র কূটনৈতিক দর্শন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা খুব মূল্যবান নয়, বরং অনেক সময় তা অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে কূটনীতি মানে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে তোলা নয়, বরং আলাদা আলাদা দর-কষাকষি, যেখানে কে কতটা চাপ দিতে পারে সেটাই মুখ্য।
এ কারণেই তিনি জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যা সামলাতে অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বদলে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মতো তুলনামূলক অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পাঠাতে দ্বিধা করেননি। তাঁর কাছে আগের আলোচনার ইতিহাস না জানা দুর্বলতা নয়, বরং একটি সুবিধা হিসেবে গণ্য হয়।
ব্যবসায়িক মানসিকতার প্রভাব
ট্রাম্পের ব্যবসায়িক জীবনের দিকে তাকালে এই চিন্তাধারা আরও স্পষ্ট হয়। ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাঁর শত শত অর্থ-সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। সাবেক সহযোগীদের মতে, তিনি প্রায়ই প্রথমে কঠোরভাবে চুক্তি করতেন, পরে কাজ শেষ হলে আবার দর-কষাকষি করতেন। এতে অপর পক্ষকে কম টাকায় রাজি হতে বাধ্য করা হতো, না হলে ব্যয়বহুল মামলায় জড়াতে হতো।
চুক্তি আইনবিশেষজ্ঞরা একে ‘সুনাম বিক্রি করে দেওয়া’ বলে বর্ণনা করেন, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার বদলে তা খরচ করে তাৎক্ষণিক লাভ তুলে নেওয়া। এই একই মানসিকতা ট্রাম্পের জোট-রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়। তিনি বারবার বলেছেন, ইউরোপীয় মিত্রদের মার্কিন সুরক্ষার জন্য ‘টাকা দিতে হবে’। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ন্যাটোর নিয়ম না মানলে রাশিয়া যেন তাদের সঙ্গে ‘যা খুশি তা–ই’ করতে পারে।
প্রতিশ্রুতি ভাঙার পরিণতি
ট্রাম্প মাফিয়াপ্রধানের মতো আচরণ করেন না, কিন্তু সমস্যাটি হলো তিনি নিজের কথাও সব সময় রাখেন না। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালে আমেরিকা তাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কথা বলেন বা আচরণ করেন, যাতে তারা সন্দেহ করে—যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ন্যাটোর প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি মানবে কি না। ফলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায়—টাকা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সুরক্ষার নিশ্চয়তা স্পষ্ট নয়।
এভাবে প্রতিশ্রুতি ভেঙে কখনো কখনো স্বল্পমেয়াদে লাভ করা যায়, তবে সেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে সম্ভব। যখন লেনদেন একবারের জন্য হয়, ভবিষ্যতে আবার সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, আর আগের আচরণের খবর সহজে ছড়ায় না, তখন এটা কাজ করতে পারে। ট্রাম্পের ব্যবসা ছিল এমনই—এক শহরে হোটেল, অন্য শহরে ক্যাসিনো, অন্য কোথাও লাইসেন্সিং চুক্তি। তাই এক জায়গার সুনাম নষ্ট হলেও অন্য জায়গায় নতুনভাবে শুরু করা যেত।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি এমন নয়। দেশগুলোর সম্পর্ক বারবার হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে। তারা একে অপরের আচরণ লক্ষ করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং অতীতের অভিজ্ঞতা মনে রাখে। এখানে সুনাম শুধু এক দেশের কাছে নয়, সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যদি একটি চুক্তি ভাঙে, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখে।
এ কারণেই নিউ স্টার্ট চুক্তি শেষ হওয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার ব্যাপার নয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরকে সরাসরি পরিদর্শন করত, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তথ্য দিত, কোথায় কী সরানো হচ্ছে তা আগে জানাত। এতে অনিশ্চয়তা কমত। পারমাণবিক কৌশলে অনিশ্চয়তা কমানো অনেক সময় অস্ত্র কমানোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই-বাছাইয়ের এই ব্যবস্থাগুলোই আসলে ভবিষ্যতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
পারমাণবিক স্থিতিশীলতার সংকট
যখন যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা ভেঙে যায়, তখন জায়গা নেয় সন্দেহ। পারমাণবিক কৌশলে এই সন্দেহ দ্রুত বাড়তে থাকে। দুই পক্ষই ধরে নেয়—অন্য পক্ষের সামর্থ্য ও উদ্দেশ্য হয়তো সবচেয়ে খারাপ। তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে চায়; আরও বেশি ওয়ারহেড মোতায়েন করে, সতর্কতা বাড়ায়, নতুন অস্ত্র বানানো বা পুরোনো অস্ত্র আধুনিক করার গতি বাড়ায়। ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
অনেক সময় এটা আগ্রাসী মনোভাব থেকে নয়; বরং তথ্যভিত্তিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ার ফলেই ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান শক্তি যদি নিজেই এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে অন্য দেশগুলোও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার বদলে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা শুরু করে।
ভবিষ্যতের জন্য হুঁশিয়ারি
এর মূলে আছে ‘রাজনৈতিক সময়’ নিয়ে ভিন্ন ধারণা। বিষয়টি এই নয় যে কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে আর কেউ ভাবে না; বরং ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখা হয়, সেটাই আসল। ‘প্রাতিষ্ঠানিক সময়’ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এতে লাগে অভিজ্ঞতা, যাচাই ব্যবস্থা, জোট ও অতীতের স্মৃতি। বিশ্বাস তৈরি হয় সময় নিয়ে এবং সরকার বদলালেও তা টিকে থাকে।
অন্যদিকে ‘পর্বভিত্তিক সময়’ হলো লেনদেনকেন্দ্রিক। এখানে আলোচনা মানে একেকটি আলাদা ঘটনা, যা অতীতের সঙ্গে খুব বেশি যুক্ত নয় এবং ভবিষ্যতের প্রতিও খুব দায়বদ্ধ নয়। সাফল্য মাপা হয় তাৎক্ষণিক ফল দিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব দিয়ে নয়। ট্রাম্প যখন বলেন, তিনি এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করবেন—এটা শুধু বাড়াবাড়ি কথা নয়; এতে বোঝা যায়, তিনি ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন না।
ডিলমেকারের এই চিন্তাধারা স্বভাবতই পর্বভিত্তিক। এখানে প্রতিপক্ষকে গভীরভাবে জানা কোনো শক্তি নয়, বরং বাড়তি ঝামেলা। আগের চুক্তিগুলোর সীমাবদ্ধতা বোঝাও বাস্তবতা নয়, দুর্বলতা বলে মনে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি ভবিষ্যৎ গড়ার উপায় না হয়ে অতীতের বোঝা বলে মনে হয়।
কিন্তু পারমাণবিক স্থিতিশীলতা এভাবে চলে না। এটি নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ম, আস্থা ও পূর্বানুমেয় আচরণের ওপর। শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, ভবিষ্যতে সেই অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার বা পরিবর্তন হতে পারে—তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকাও জরুরি। যাচাই ব্যবস্থা ভেঙে গেলে শুধু নিয়ন্ত্রণ কমে না; একে অপরকে বোঝার যৌক্তিক ভিত্তিটাও নষ্ট হয়।
ডিলমেকারের যুক্তি হলো একটি আলোচনা ব্যর্থ হলে অন্য কারও সঙ্গে নতুন করে শুরু করা যাবে। কিন্তু পারমাণবিক কৌশলে এমন সুযোগ নেই। এখানে নতুন বাজার নেই, নতুন প্রতিপক্ষ নেই, আর ভয়াবহ ভুল হলে দ্বিতীয়বার ঠিক করার সুযোগও নেই। নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় একসময় এই কৌশলের সীমা ধরা পড়েছিল। ঠিকাদার, ব্যাংক ও সরবরাহকারীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবসা করতে অস্বীকার করেন।
তখন সুনামের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু মার্কিন ভোটারদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তারা দুবার এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন, যার ব্যবসায়িক ধরনই ছিল অন্যের আস্থা ভেঙে লাভ করা। এর ফল কতটা ক্ষতিকর হবে, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে নিউ স্টার্ট চুক্তির শেষ হওয়া একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—প্রতিশ্রুতি ভাঙার এই প্রবণতা শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি পুরো বিশ্বের জন্য ঝুঁকির।
৫০ বছরের বেশি সময় পর এই প্রথম প্রায় ৮ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র দুই দেশের কাছে আছে; কিন্তু সেগুলোর ওপর এখন কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই, ঠিকমতো যাচাই করার ব্যবস্থাও নেই। ভাবলে ভয় লাগে—দশকের পর দশক ধরে যে পারমাণবিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা গড়ে উঠেছিল, তা খুব অল্প সময়েই ভেঙে যেতে পারে, যদি কোনো নেতা মনে করেন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা দুর্বলতার চিহ্ন।



