বিএনপির জয়ের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন অধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বিএনপির জয়ের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

বিএনপির জয়ের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় লাভ করার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক ও পরিমিত উষ্ণতার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় দেওয়া এক বার্তায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তাঁর দলের বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোদি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশী দেশের প্রতি ভারতের সমর্থনের অঙ্গীকার করেন এবং দুই দেশের ‘বহুমুখী সম্পর্ক’ জোরদার করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

ইতিহাসের জটিল পটভূমি

২০২৪ সালের জুলাই মাসে জেনারেশন-জেড নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। দেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেওয়া এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নীতির কারণে অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, দিল্লির সমর্থনই হাসিনার পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল। সীমান্ত হত্যা, পানি বিরোধ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরোনো অভিযোগগুলিও সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ভিসা পরিষেবা অনেকাংশে স্থগিত, আন্তসীমান্ত ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইটও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

২০০১ সালে তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল, তখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। বিএনপি-জামায়াত আমল ছিল অস্থিরতা এবং গভীর পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা। প্রাথমিক সৌজন্য হিসেবে ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র প্রথম বিদেশি প্রতিনিধি হিসেবে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানালেও আস্থা ছিল নড়বড়ে। বিএনপি যেভাবে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছিল, তা দিল্লির মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল যে ঢাকা কৌশলগতভাবে ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও বিশ্লেষণ

দিল্লির জন্য এখন প্রশ্নটি বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা নিয়ে নয়; বরং প্রশ্ন হলো—কীভাবে রাখা হবে সেটি নিয়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ দমনের মতো নিজেদের ‘রেড লাইন’ বা স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সুরক্ষিত রেখে কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে আলোচনার বিষয়বস্তু করা থেকে দূরে থাকা যায়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘বিএনপি এ লড়াইয়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী। ভারতের জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ বাজি। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন? তিনি স্পষ্টতই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। তবে এটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।’

ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৫ বছরে শেখ হাসিনা দিল্লির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত চাহিদাগুলো পূরণ করেছিলেন—বিদ্রোহীদের দমনে নিরাপত্তা সহযোগিতা, উন্নত কানেক্টিভিটি এবং চীনের বদলে ভারতের অনুকূলে থাকা সরকার। এ অংশীদারত্ব দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে যতটা মূল্যবান ছিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হাসিনাকে তার জন্য দিতে হয়েছে ততটাই চড়া মূল্য। বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দমন-পীড়নের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। জাতিসংঘের মতে, ওই সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে ভারতের অস্বীকৃতি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার চেষ্টাকে আরও জটিল করেছে।

পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান এ সমীকরণে একটি কেন্দ্রীয় কিন্তু সংবেদনশীল বিষয়। হাসিনার পতনের পর ঢাকা ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে একদমই সময় নষ্ট করেনি। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর গত মাসে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। এর আগে গত ১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সফর বিনিময় করেছেন, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে এবং ২০২৪-২৫ সালে বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসেসের কর্মকর্তা স্মৃতি পট্টনায়েক বিবিসিকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ নেই। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার আছে। অস্বাভাবিক ছিল, হাসিনার আমলে প্রায় কোনো যোগাযোগ না থাকা। তখন পেন্ডুলাম একদিকে বেশি হেলে পড়েছিল। এখন ঝুঁকি হচ্ছে, এটি অন্যদিকে খুব বেশি হেলে পড়ে কি না।’

নতুন সম্পর্ক গড়ার পথ

এত অস্থিরতা সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনীতি দুই দেশকে বেঁধে রেখেছে। এর মধ্যে আছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। দুই দেশ বার্ষিক সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল ও বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ আয়োজন করে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ভারতের ৫০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট রয়েছে।

অধ্যাপক পালিওয়াল উল্লেখ করেছেন, এই ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি নির্ভর করবে ঢাকার নতুন নেতৃত্ব ভারতবিরোধী মনোভাব কতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং দিল্লি তাদের উসকানিমূলক বার্তাগুলো কতটা কমাতে পারে তার ওপর। সম্প্রতি একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলোও এর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পালিওয়াল বলেন, ‘যদি তারা ব্যর্থ হয়, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে; তবে পরিস্থিতি “নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার” মধ্যেই আটকে থাকবে।’

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ‘বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ভারতেরই উচিত এগিয়ে আসা। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী নির্বাচন করেছে। এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হোন, দেখুন, কোথায় আমরা সাহায্য করতে পারি। আমি আশাবাদী যে বিএনপি অতীতের শিক্ষা থেকে শিখেছে।’ অন্য কথায়, নতুন করে সম্পর্ক গড়ার সাফল্য নির্ভর করতে পারে যে বিষয়টির ওপর তা হলো—বাগাড়ম্বর কম করে বৃহত্তর প্রতিবেশী সতর্কতার বদলে আত্মবিশ্বাস বেছে নেয় কি না, তার ওপর।