কেরানীগঞ্জে রিয়াজ হত্যা মামলায় ৩১০ আসামির অব্যাহতি, তদন্তে ভুল ঘটনাস্থল প্রমাণিত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় গুলিতে শিক্ষার্থী রিয়াজ (২১) নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কেরানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদসহ এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত ৩১০ আসামিকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। তদন্তে পুলিশ দেখতে পায়, কথিত ঘটনাস্থল কেরানীগঞ্জে ঘটনার দিন কোনও গুলিবর্ষণের ঘটনাই ঘটেনি; বরং রিয়াজ মোহাম্মদপুর এলাকায় গুলিতে মারা যান। এই তথ্যগত ভুলের ওপর ভিত্তি করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করায় আসামিরা এ অব্যাহতি পেলেন।
তদন্ত শেষে অব্যাহতির আবেদন ও আদালতের সিদ্ধান্ত
তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মো. ইলিয়াস হোসেন গত বছরের ১৫ জুলাই আদালতে এ অব্যাহতির আবেদন করেন। ১২ আগস্ট ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা ইয়াসমিন এবং সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্নার পৃথক আদালত মামলার নথিপত্র, পুলিশের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে এ আদেশ দেন। সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জিআরও শাখার উপ-পরিদর্শক আবদুল নূর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আসামিদের অব্যাহতির বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত নেন এবং আদেশে যারা হাজতে ছিলেন, তাদের তাৎক্ষণিক মুক্তির জন্য রিলিজ অর্ডার ইস্যু এবং মামলাটি চিরতরে নথিজাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেরানীগঞ্জের আলোচিত শাহীন চেয়ারম্যানসহ বড় পদধারীদের অব্যাহতি
আদালতের নথি ও এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মামলাটিতে এজাহারনামীয় ১১০ জন এবং অজ্ঞাত আরও প্রায় ২০০ জনসহ মোট ৩১০ জন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও পদধারীরা হলেন:
- কেরানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি শাহীন আহমেদ (৫০)
- উপজেলার শাক্তা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাবের হোসেন (৫০)
- কালিন্দী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, আনোয়ার হোসেন আয়নাল (৫৩)
- কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য মো. জসিম উদ্দিন পিন্টু (৫৪)
এছাড়াও অব্যাহতি পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মূল কারণ ও তদন্তের প্রাপ্তি
মামলাটির তদন্ত শেষে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইলিয়াছ হোসেন আদালতে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে ঘটনার মূল রহস্য ও তথ্যগত ভুলগুলো সামনে আসে।
ভুল ঘটনাস্থল
এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কেরানীগঞ্জ মডেল থানার শাক্তা ইউনিয়নের আরশিনগর এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পুলিশের তদন্ত ও স্থানীয় লোকজনের সাক্ষ্য বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়, ওই তারিখে আরশিনগর এলাকায় কোনও মারামারি বা গুলির ঘটনাই ঘটেনি।
প্রকৃত ঘটনা মোহাম্মদপুরে
শিক্ষার্থী রিয়াজ প্রকৃতপক্ষে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানার বসিলা র্যাব ক্যাম্প-২ এর সামনে গুলিতে নিহত হন। এই বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় ইতোমধ্যে একটি নিয়মিত মামলা সচল রয়েছে। বসিলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রিয়াজকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তার মরদেহ কেরানীগঞ্জ এলাকায় ফেলে যায়। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রিয়াজের চাচা রমজান আলী শওকত বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় এ মামলা দায়ের করেন।
যেহেতু ঘটনাটি কেরানীগঞ্জ মডেল থানা এলাকার আওতাভুক্ত নয় এবং এজাহারের ঘটনার সত্যতা মেলেনি, তাই তদন্ত কর্মকর্তা এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, মামলার এজাহারকারী পক্ষের কোনও আপত্তি বা নারাজি নেই। তদন্তে কোনও ত্রুটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সার্বিক পর্যালোচনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানা থেকে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হলো এবং সব আসামিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, "মোহাম্মদপুরের ঘটনা কেরানীগঞ্জে দেখিয়ে মামলা করেছিলেন বাদী। যেটি তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে।" বাদীকে এর জন্য আইনের আওতায় এনে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, "বাদী ভুল স্বীকার করেছে, বুঝতে পারেনি।"
এ বিষয়ে মামলার বাদী মো. রমজান আলী শওকতকে বারবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি।



