বেরোবি শিক্ষার্থী হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আইনজীবীর তীব্র সমালোচনা
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্যের পর এই মন্তব্য এসেছে, যা মামলাটির আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অভিযোগপত্রে আসামি সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ছয় জন পুলিশ সদস্য আবু সাঈদের ওপর লাঠিচার্জ করলেও অভিযোগপত্রে মাত্র একজনকে আসামি করা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তদন্ত প্রতিবেদনকে গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ করে তুলেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং বেরোবির কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করছেন, যাদের তিনি নির্দোষ দাবি করে চলেছেন।
গুলির অস্তিত্ব না পাওয়া ও লাঠির আইনি অবস্থান
আইনজীবী দুলু তার যুক্তিতে দুটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমত, তিনি বলেন যে রেডিওগ্রাফিক বা এক্স-রে পরীক্ষায় আবু সাঈদের শরীরে গুলির কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি, তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে আবু সাঈদের গলা থেকে কোমর পর্যন্ত পরা কালো টি-শার্টের জব্দ করা অংশে কোনও ছিদ্র ছিল না। ফলে, গুলির কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে—এই দাবি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে তিনি জোর দেন।
দ্বিতীয়ত, ফৌজদারি আইনে লাঠিকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবু সাঈদের হাতে লাঠি ছিল এবং তিনি সেটি দিয়ে পুলিশের আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই তথ্যটি তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেছেন, যা মামলার প্রেক্ষাপটকে জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
আইনজীবী আরও মন্তব্য করেন যে, আবু সাঈদকে নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সিভিলিয়ান হিসেবে ধরে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে আনা আইনগতভাবে কতটা যৌক্তিক, সেটি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে, তিনি স্বীকার করেন যে আবু সাঈদ একজন বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনকারী ছিলেন এবং রাষ্ট্র সেই বীরত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে—এ বিষয়ে তার কোনও দ্বিমত নেই। এই মন্তব্য মামলার নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।
প্রসিকিউটরের বক্তব্য ও রায়ের দিন নির্ধারণ
এ প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম বলেন, এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৯ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তিনি উল্লেখ করেন যে তারা ২৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন, যার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, পুলিশ ও বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। প্রসিকিউটর দাবি করেন যে তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন, বিধায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করছেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে মামলাটির আইনি লড়াই আরও তীব্রতা পেয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করছে।
সামগ্রিকভাবে, এই মামলাটি ন্যায়বিচার, তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। রংপুরে সংঘটিত এই ঘটনাটি শিক্ষার্থী আন্দোলন, পুলিশি কার্যক্রম এবং আইনি ব্যবস্থার মধ্যে জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলছে, যা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিতে পারে।



