যশোরে ব্যবসায়ী অপহরণ: সংবাদ সম্মেলনে চার বছরের শিশুর আবেদন, 'বাবাকে ফিরিয়ে দেন'
চার বছর বয়সী রিদার জন্য সংবাদ সম্মেলন বোঝার বয়স হয়নি। মায়ের কোলে চড়ে সে এসেছে যশোর প্রেসক্লাবে, যেখানে অপহৃত বাবা জাহাঙ্গীর আলমের মুক্তির দাবিতে পরিবারটি মুখ খুলেছে। টেবিলে সাজানো মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে রিদা হঠাৎ বলে ওঠে, 'আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন, আমার বাবা আমাকে অনেক আদর করে। আমি শুধু বাবাকে ফিরে পেতে চাই। আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমার বাবার জন্য আমার খুব পরাণ পড়ছে। বাবাকে ছাড়া একটুও ভাল্লাগে না আমার। কিচ্ছু ভাল্লাগে না।'
মায়ের কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার
রিদার এই আবেগঘন কথায় পুরো কনফারেন্স হল পিনপতন নীরবতায় ডুবে যায়। সন্তানের কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রেশমা খাতুন ও তার বড় দুই মেয়ে। বুধবার (৪ মার্চ) বিকালে যশোর প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অপহরণের তিন দিন পরও জাহাঙ্গীর আলমের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারটি চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে।
অপহরণের বিস্তারিত বর্ণনা
জাহাঙ্গীর আলম (৪৮) যশোর শহরের শংকরপুরে ভেটেরিনারি হাসপাতালের সামনে আর আর মেডিক্যাল নামে ভেটেরিনারি ওষুধের ব্যবসা করেন। তিনি তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে শহরতলি সুজলপুর এলাকায় বসবাস করেন। গত সোমবার রাতে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে চাঁচড়া রায়পাড়া পীরবাড়ি মোড়ে কয়েকজন দুর্বৃত্ত একটি সাদা প্রাইভেটকারে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
অপহরণের পর জাহাঙ্গীরের মোবাইল ফোন থেকে রাত ১০টার দিকে তার স্ত্রীর ফোনে কল করে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। হুমকি দেওয়া হয়, টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে। এরপর থেকে মোবাইল ফোনটি বন্ধ রয়েছে। ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ এখনো জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করতে পারেনি।
স্ত্রীর কান্নাজড়িত আবেদন
সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেশমা খাতুন বলেন, 'সাত বছর ধরে শংকরপুর ভেটেরিনারি হাসপাতালের সামনে ওষুধের ব্যবসা করে আসছে। রাতে তারাবি পড়ে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফেরে প্রতিদিন। তবে সোমবার আর ফেরেনি। সে না ফেরাতে তিন সন্তানকে নিয়ে আমি দুঃচিন্তায় রয়েছি। আমার বড় মেয়ে সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে; এমন অবস্থায় সেও তার বাবাকে নিয়ে দুঃচিন্তায় রয়েছে।'
তিনি আরো যোগ করেন, 'আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিন দিন পার হয়ে গেছে; তার সন্ধান পাচ্ছি না। আমরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার স্বামীকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার ও অপহরণকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।'
পুলিশের তদন্ত ও আশ্বাস
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, 'ভুক্তভোগী পরিবার এ ঘটনায় অভিযোগ দিলে আমরা মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছি। অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। ব্যবসা না পূর্বের কোনো শত্রুতার থেকে এটি ঘটেছে বা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না; সেটি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। আমরা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। আশা করি, দ্রুত উদ্ধার করতে পারব।'
এই ঘটনা যশোর এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে একটি পরিবার অপহরণের শিকার হয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শিশু রিদার নিরীহ আবেদন সমগ্র সমাজের কাছে একটি জোরালো বার্তা হয়ে ধরা দিয়েছে।



