বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট: ব্যাংক ঋণ ও প্রশাসনিক জটিলতায় উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগ
তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট: ব্যাংক ঋণে উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগ

তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট: ব্যাংক ঋণ ও প্রশাসনিক জটিলতায় উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং শিল্পায়নের বিস্তারে এ খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ঋণ, আর্থিক সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উদ্যোক্তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও ঋণের বোঝা, কোথাও মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন অনেকে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, যা ব্যবসায়ী মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ব্যাংক ঋণ ও সহযোগিতার অভাব

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাংকগুলো অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না দিয়ে উল্টো কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারে না। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পুলিশ লাইন এলাকায় অবস্থিত রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ডেনিসন অ্যাটায়ার্স লিমিটেড এর একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাইদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মহামারির সময় বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানই আর্থিক সংকটে পড়ে। সেই সময় সামান্য আর্থিক সহায়তা পেলে তার প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল।” তার ভাষায়, “শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য মাত্র দুই কোটি টাকা ঋণ পেলে কারখানাটি চালু রাখা যেতো। কিন্তু ব্যাংক থেকে সেই সহযোগিতা পাইনি।”

সাইদুল হক জানান, তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে মোট ২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যবসার বিভিন্ন সময়ে তিনি ঋণের একটি অংশ পরিশোধও করেছেন। তবে তার অভিযোগ, ব্যাংক সুদ ও বিভিন্ন চার্জ বাবদ ১৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় করলেও সেই অর্থ মূল ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। বরং পুরো অর্থকে সুদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, “ঋণের বিপরীতে আমরা নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করেছি। কিন্তু ব্যাংকের হিসাব পদ্ধতির কারণে মূল ঋণ কমেনি। এতে ব্যাংকের আয় বাড়লেও শেষ পর্যন্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলসি বন্ধ ও রফতানি অর্ডার বাতিল

সাইদুল হকের অভিযোগ অনুযায়ী, সংকটের সময় ব্যাংক তার প্রতিষ্ঠানের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সুবিধা বন্ধ করে দেয়। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া বেশ কিছু অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। রফতানিমুখী শিল্পে এলসি সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন এবং রফতানি—সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকিং সহায়তা প্রয়োজন হয়। এলসি বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংকটের সময় সহযোগিতা করার বদলে ব্যাংক নানা ধরনের চাপ ও হয়রানি করেছে। তার ভাষায়, “সংকটের সময় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর চেষ্টা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা উল্টো চাপের মুখে পড়েছি।”

ঋণের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতায় বিপর্যস্ত উদ্যোক্তারা

ব্যবসায়ী মহলের অনেকের মতে, করোনার ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে বহু প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সময় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের কাঠামো, সুদের হিসাব এবং বিভিন্ন চার্জের কারণে অনেক সময় ঋণগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের নিয়মকানুন। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

দেনার চাপে মৃত্যু উদ্যোক্তার

ঋণের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতায় বিপর্যস্ত হয়ে এক প্রবীণ গার্মেন্টস উদ্যোক্তার মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। মৃত ব্যবসায়ীর নাম মহিউদ্দিন। তিনি রাজধানীভিত্তিক মুনলাক্স নামের একটি পোশাক কারখানার মালিক ছিলেন। প্রায় চার দশক ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস মহামারির সময় তার কয়েকটি রফতানি চালান বাতিল হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে ব্যাংকের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি কারখানাটি বন্ধ করে দেন।

সূত্র জানায়, গত প্রায় তিন বছর ধরে তিনি ভ্যাট অফিস, কাস্টমস বন্ড ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন দফতরে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দেনাদারদের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি চরম মানসিক সংকটে পড়েন। ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ক্রমাগত দুশ্চিন্তা ও চাপের মধ্যে থাকায় তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গত ১৩ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ব্যবসায়ী মহলে এই ঘটনা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

শিল্প খাতের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট

শিল্প খাতের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বহু কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—বৈশ্বিক বাজারের চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের জটিলতা মূল কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া হতো, অনেক প্রতিষ্ঠান আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। কিন্তু ব্যাংকিং কঠোরতা এবং নীতিগত অনমনীয়তার কারণে সেই সুযোগ অনেকেই পাচ্ছেন না।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও অসহযোগিতা

শীর্ষ শিল্প গ্রুপগুলো—যারা লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব দিয়েছে— তারা বিপদে পড়লেও ব্যাংকগুলোর সহায়তা পাচ্ছেন না। ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছিল, যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছে, তাদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো শর্তের জালে ফেলে দিচ্ছেন। এতে ব্যাংকও লাভবান হচ্ছে না, গ্রুপও টিকে থাকছে না, লাখো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সরকারের রাজস্বও কমছে।

শীর্ষ গ্রুপের দুর্ভোগ

কয়েকটি ব্যাংকের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়েছেন দেশের শীর্ষ রফতানিমুখী ও শিল্পগ্রুপগুলো—থার্মেক্স গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, রূপায়ণ গ্রুপ। এই গ্রুপগুলো সরকারের রাজস্বে অবদান রেখে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বর্তমানে তাদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা দিতে ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো আচরণ করছেন, যার ফলে গ্রুপগুলো ব্যবসা সচল রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এক শিল্প গ্রুপের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত এসেছে—২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু এসআইবিএল, ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক তা মানছে না। ফলে ব্যবসা সচল রাখা ও শ্রমিকদের চাকরি রক্ষা করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেশের ক্ষতি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শুধু উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, রফতানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে কর্মরত শত শত শ্রমিকের জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, নীতি-সহায়তা কমিটি এখন কার্যকর নেই। এখন ব্যাংকগুলো নিজেদের ভিত্তিতে গ্রাহকদের স্বল্প ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে পারবে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই মনে করেন, শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার আরও সহায়ক ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে সাময়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এদিকে ব্যাংকিং খাতের ভেতরেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে ভুয়া রফতানি দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনাগুলো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।