মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাতে জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। এই সংকটের ফলে দেশের তৈরি পোশাক খাত গভীর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে শিল্পকারখানাগুলো তাদের উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে দিয়েছেন, যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন ও রপ্তানিতে।
কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকেও উৎপাদন করতে পারছে না
তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকেও উৎপাদন করতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মো. ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখনো সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব ব্যাপকভাবে না পড়লেও লম্বা সময় এই সংকট চললে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।’ তিনি অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
শিল্পমালিকরা জ্বালানি পাচ্ছেন না, অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে
কিছু ব্যবসায়ীর অভিযোগ রয়েছে, শিল্পমালিকরা কারখানা সচল রাখতে চাহিদামতো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাচ্ছেন না। অনেক পাম্পে তেল থাকলেও দিচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে। অনেক সময় তৈল নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্যতেল, ওষুধ, সার এবং কৃষি সম্পর্কিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে। লোহিত সাগর হয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে লিডটাইম বেড়েছে এবং কনটেইনার ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকছে বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ে না; বরং পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে আমাদের ক্রয়াদেশ হ্রাসের একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
সরকারের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং চাহিদামতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। কমিটির পক্ষ থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আরও বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের মেম্বারদের কারখানা পরিচালনার জন্য জেনারেটরের কি পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন তার একটি চাহিদাপত্র সংগ্রহ করছি। এই চাহিদাপত্র নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। যেন আমাদের উৎপাদন ও ট্রান্সপোর্ট সচল থাকে।’
তথ্যমতে, দেশের শিল্প খাত প্রধানত গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



