হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল বিপর্যয়: জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত কৃষকের স্বপ্ন
হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতায় বোরো ফসল বিপর্যয়

হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল বিপর্যয়: জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত কৃষকের স্বপ্ন

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় অন্তত অর্ধশত হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, যা নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, যেখানে কাঁচা ধান গাছে পচন ধরতে শুরু করেছে।

বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস ও ক্ষতির আশঙ্কা

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সিলেট বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই পূর্বাভাসের ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

জলাবদ্ধতা নিরসনে একদল কৃষক হাওরে বাঁধ কেটে দিতে চাইছেন, কিন্তু অন্য আরেক দল কৃষক ও স্থানীয় প্রশাসন এতে বাধা দিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের ডাকুয়া হাওরে জলাবদ্ধতা বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ কেটে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চারটি গ্রামের লোকজন সংঘর্ষে জড়ায়, যাতে ১৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনকে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে, এবং এমন ঘটনা আরও কয়েকটি হাওরে ঘটছে বলে জানা গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষতিগ্রস্ত হাওরগুলোর তালিকা

ইতোমধ্যে তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের সিংহ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওড়, জামালগঞ্জের হালির হাওড়, পাগনার হাওড়, তাহিরপুরের শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়, দিরাই উপজেলার কালিকোটা, টাংনি, হুরামন্দিরা, বরাম ও চাপতির হাওর, মধ্যনগরের ঠগার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাই হাওর, খাই হাওর, জামখলা হাওর ও কাঁচিভাঙা হাওরসহ অর্ধশতাধিক হাওরের নিচু জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের সমালোচনা

সরকার ফসল রক্ষায় শত শত কোটি টাকা খরচ করলেও পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বছর সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে ১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু ২০১৭ সালের ব্যাপক ফসল হানির পর বিগত সাত বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা বাঁধের নিচে খরচ হয়েছে। এই বাঁধই এখন কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সমীক্ষা ছাড়াই হাওরে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।

সমাধানের পথ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা

হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা খুব জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। গবেষণার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে হাওর সমস্যার সমাধান করতে হবে। দুয়েকদিনের মধ্যে হাওর থেকে পানি নামানোর ব্যবস্থা করলে কিছু ধান রক্ষা পেতে পারে, কিন্তু স্থানীয়ভাবে কৃষকরা পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন— যা যথেষ্ট নয়।

কৃষকদের দাবি ও প্রযুক্তিগত সমাধান

কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্লুইসগেট স্থাপন ও পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছেন। হাওরের কিছু অংশে স্লুইসগেট স্থাপন করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি অপসারণ করা সম্ভব হবে, তবে এ ব্যাপারে সতর্কতা প্রয়োজন। স্লুইসগেটের সক্রিয় ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে, যাতে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

টেকসই পরিকল্পনা ও দুর্নীতির অভিযোগ

স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে হাওর ব্যবস্থাপনার একটি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অপরদিকে, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি, যা নজিরবিহীন বলে হাওরের অধিকার কর্মীরা সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন।

সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সরকার খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা হাওর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে খাল ও নদী খনন করে সমস্যা লাঘব করতে পারে। তবে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে খাল বা নদী খনন কাজে আসবে না; ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নদীগুলো খনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। বোরো মৌসুমে হাওরে যেমন অনাহুত পানি জমতে দেওয়া যাবে না, তেমনই অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে ঢুকতেও দেওয়া যাবে না— এই বিপরীতমুখী দুই উদ্দেশ্য কী উপায়ে সমন্বয় হবে, তার সঠিক ও কার্যকর পথ বের করা হাওরের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।

লেখক: সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা।