গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাটে কৃষকের হতাশা: ক্রেতা কম, দাম কম
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাটে এবার ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা গভীর হতাশায় ভুগছেন। প্রতি হাটে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার শুকনা মরিচ বিক্রি হলেও গত বছরের তুলনায় ক্রেতা কম থাকায় দামও কমেছে, যা কৃষকদের আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
হাটের অবস্থান ও কার্যক্রম
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নে এই মরিচের হাটটি অবস্থিত। সপ্তাহের দুই দিন, শনি ও মঙ্গলবার, সকাল সাতটা থেকে দুপুর পর্যন্ত এখানে মরিচের বেচাকেনা চলে। গজারিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আলম মিয়া জানান, ৩৫ বছর ধরে এই হাটটি উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ মরিচের হাট হিসেবে পরিচিত। তবে হাটে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব রয়েছে; খোলা আকাশের নিচেই মরিচ বেচাকেনা হয় এবং দূরদূরান্তের ক্রেতা-বিক্রেতাদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে দুপুরের পরপরই হাট ভেঙে যায়।
কৃষকদের বক্তব্য ও চাষের পরিসংখ্যান
ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী গ্রামের মরিচচাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর ক্রেতার সংখ্যা কম হওয়ায় ন্যায্য দাম পাচ্ছি না।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ২ হাজার ৩২৩ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ৪০৩ হেক্টর এবং ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলে ৯২০ হেক্টর জমি অন্তর্ভুক্ত। এসব জমি থেকে ৫ হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদিত হওয়ার কথা, যার মধ্যে শুকনা মরিচ ২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। বিঘাপ্রতি কৃষকদের ৮ থেকে ১০ মণ শুকনা মরিচ উৎপাদিত হয় এবং চাষাবাদ খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়।
দাম ও বাজার পরিস্থিতি
এ বছর প্রতি মণ শুকনা মরিচ প্রকারভেদে ১১ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় কম। দিঘলকান্দি গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার ভালো ফলন হয়েছে, কিন্তু শুকনা মরিচের দাম কম।’ একই গ্রামের মরিচচাষি এনামুল হকও জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম কম হওয়ায় তিনি চিন্তিত। রংপুর থেকে হাটে মরিচ কিনতে আসা জয়নাল মিয়া বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি এ হাটের মরিচ কিনে প্রাণ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেন, তবে এ বছর মরিচের আমদানি বেশি হওয়ায় দাম কমেছে।
চরাঞ্চলের উৎপাদন ও সরকারি সহায়তা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৬৫টি চরাঞ্চলের জমিতে উৎপাদিত মরিচ এই হাটে আসে, যেখানে দুর্গম চরাঞ্চল থেকে কৃষকেরা বস্তাভর্তি মরিচ নৌকাযোগে বিক্রি করতে আনেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রায় অর্ধেক মরিচ ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলে উৎপাদিত হয় এবং চরাঞ্চলের লাল মরিচের চাহিদা সব সময় বেশি থাকে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মরিচচাষিদের কৃষি প্রণোদনার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
সর্বোপরি, গাইবান্ধার এই ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাটে ক্রেতা কমে যাওয়া এবং দাম হ্রাস কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।



