কৃষকদের ঋণমুক্তির ঘোষণা: সরকারের প্রথম বৈঠকেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
নতুন বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় কৃষকদের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘোষণা এলো। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রায় ১২ লাখ কৃষক ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাবেন এবং মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা মওকুফ হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বিস্তারিত ঘোষণা
বৈঠকের পর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতের সকল কৃষক এই সুবিধার আওতায় আসবেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়ার পর যত সুদই জমা হোক না কেন, সুদ-আসলসহ পুরো টাকাই মওকুফ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ, যার মূল লক্ষ্য দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ড শক্তিশালী করা।
নাসিমুল গনি আরও উল্লেখ করেন, ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে কৃষকরা এখন উন্নত মানের বীজ, আধুনিক সেচপ্রযুক্তি বা অন্যান্য কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে কৃষকদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড উন্নত হবে, ফলে তাঁরা ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারবেন এবং স্থানীয় মহাজনদের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারকালে গত ২৯ জানুয়ারি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়লাভ করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর গতকালের বৈঠকে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
অর্থনীতিবিদদের মতামত ও সম্ভাব্য প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এটা সুফলভোগী কৃষকের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাবে, আবার চাষাবাদে বিনিয়োগের সুযোগ দেবে এবং মানসিক স্বস্তিও এনে দেবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের জন্য এটি একটি নতুন সূচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং অর্থায়নের উৎস নিয়েও ভাবনা জরুরি। ঋণ মওকুফ ভবিষ্যতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের প্রবণতায় প্রভাব ফেলতে পারে, এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা এতে বৈষম্যের অনুভূতি পেতে পারেন। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে ঋণ মওকুফের পাশাপাশি টেকসই কৃষি সহায়তা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, ফসল বিমা ও সহজ শর্তে পুনঃ অর্থায়নের মতো কাঠামোগত সংস্কার চালু করা।
ব্যাংকভিত্তিক পরিসংখ্যান ও বিতরণ পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি ব্যাংকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা ৬ লাখ ৬১ হাজার ৭৬৩ জন এবং মোট ঋণের পরিমাণ ৬২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সোনালী ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, সরকারের অন্যান্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের পথে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ড চালুর প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে আগামী ১০ মার্চ ১৪টি উপজেলার একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে, যার আওতায় প্রতি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবে।
সরকারের এই পদক্ষেপ কৃষি খাতের পুনরুজ্জীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যদিও এর টেকসই বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
