চাঁদপুরের তরুণ ইকরাম খানের আঙুর চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য
চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ছোট হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইকরাম খান (২৬) একটি সাধারণ আঙুর চারা থেকে শুরু করে আজ প্রায় ১৫০ জাতের আঙুরবাগানের মালিক হয়েছেন। এইচএসসি পাসের পর পড়াশোনা না চালিয়ে তিনি স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে গ্রামে ফিরে আসেন এবং কৃষি খাতে অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
একটি চারা থেকে যাত্রা শুরু
২০২১ সালে ইকরাম খানের সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বড় ভাই ইন্দোনেশিয়া থেকে একটি আঙুরের চারা উপহার দেন। তিনি সেই চারা বাড়ির ছাদবাগানে রোপণ করেন এবং এক বছর পর গাছটিতে থোকায় থোকায় আঙুর ফলতে দেখে আঙুর চাষের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই সাফল্য তাঁকে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করে।
১৫০ জাতের আঙুরবাগান গড়ে তোলা
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইকরাম খান বিদেশ থেকে অনলাইন ও লোক মারফত ১৫০টি উন্নত জাতের আঙুর চারা সংগ্রহ করেন। পরে তিনি নিজ গ্রামের ১৮ শতক পৈতৃক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে একটি আধুনিক আঙুরবাগান সাজান। বর্তমানে তাঁর বাগানে ব্ল্যাক ম্যাজিক, গ্রিনলন, ভ্যালেজ, সুপারনোভা, এঞ্জেলিকাসহ প্রায় ১৫০ জাতের আঙুরগাছ রয়েছে।
বাগানটিতে লাল, হলুদ, কাঁচা, পাকা ও আধা পাকা নানা রঙের থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলতে দেখা যায়, যা দৃষ্টিনন্দন ও কৃষি সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের এই বাগানটি একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশে অবস্থিত।
বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকা আয়
ইকরাম খান গত জানুয়ারি থেকে আঙুর পাকা শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৬০০ কেজির বেশি পাকা ও আধা পাকা বিষমুক্ত আঙুর উৎপাদন করেছেন। তিনি পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের চারা বিক্রি করে আরও ছয় লাখ টাকা আয় করেছেন। সব মিলিয়ে এক বছরে তাঁর মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা।
তাঁর উৎপাদিত আঙুর মিষ্টি, সুস্বাদু ও বিষমুক্ত হওয়ায় স্থানীয় বাজার এবং রাজধানীতে এর চাহিদা ব্যাপক। বেশির ভাগ আঙুর বাগান থেকেই সরাসরি বিক্রি হয়, যা তাঁর আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করছে।
পারিবারিক পটভূমি ও দৈনন্দিন জীবন
ইকরাম খান সায়েদুল ইসলাম খানের ছেলে এবং চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। তিনি বর্তমানে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলার কলাদী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। সেখান থেকে প্রায় প্রতিদিন গ্রামে গিয়ে আঙুরবাগানের দেখভাল করেন, যা তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় দেয়।
স্থানীয় প্রশংসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হালিম ইকরামের সাফল্যকে মনোযোগ ও পরিশ্রমের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি ইকরামের বাগান কয়েকবার পরিদর্শন করেছেন এবং বিষমুক্ত ও সুস্বাদু আঙুর চাষ করে ইকরাম এলাকায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কৃষি কার্যালয় থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
ইকরাম খান ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করতে চান। তাঁর দাবি, দেশে আঙুরের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার আরও কয়েকজন তরুণ আঙুর চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, যা কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করছে।



