ইরান যুদ্ধে পানামা খালের চাপ, মালাক্কায় টোল প্রস্তাবে উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
ইরান যুদ্ধে পানামা খালের চাপ, মালাক্কায় টোল প্রস্তাব

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাণিজ্যে পরিবর্তন: পানামা খালের ওপর চাপ, মালাক্কায় টোল প্রস্তাব

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাণিজ্যে যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানামা খাল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জরুরি পণ্য পরিবহনে পানামা খালের ব্যবহার বেড়েছে কয়েক গুণ। এ অবস্থায় দ্রুত খাল পার হতে আকাশচুম্বী খরচ করতেও পিছপা হচ্ছে না জাহাজগুলো।

হরমুজ বন্ধে পানামা খালের ওপর চাপ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই এই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ব জুড়ে নৌ-চলাচলের রুটে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এর ফলে এশিয়ার শোধনাগারগুলো তাদের কৌশল পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। তারা এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভর না করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ও গ্যাস কিনতে শুরু করেছে। আর এই পণ্য পরিবহনের জন্য আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্তকারী পানামা খালই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ ৪০ লাখ ডলারে সিরিয়াল কিনে আগে পার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই খালটি অতিক্রম করতে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলো আকাশচুম্বী অর্থ ব্যয় করতেও পিছপা হচ্ছে না।

পানামা খাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের পর থেকে এ ধরনের লাইন এড়ানোর পেমেন্টের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বিশ্ব জুড়ে জ্বালানির দামে অস্থিরতা তৈরির অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মালাক্কা প্রণালিতে টোল প্রস্তাব: ইন্দোনেশিয়ার উদ্যোগ

এদিকে হরমুজের পর এবার মালাক্কা প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে টোল আদায় করতে চায় ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বুধবার জাকার্তায় এক সিম্পোজিয়ামে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে পুরবায়া জানান, ইন্দোনেশিয়া এখন আর নিজেদের 'প্রান্তিক দেশ' হিসেবে দেখতে চায় না।

তিনি বলেন, "বিশ্বের বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের মতো কৌশলগত রুটে অবস্থিত হওয়ার পরও মালাক্কা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো শুল্ক নেওয়া হয় না।" এই প্রস্তাবের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি ইরানের হরমুজ প্রণালির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। ইরানের মতো ইন্দোনেশিয়াও এই শুল্ক থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে পুরবায়া স্বীকার করেছেন, এমন নীতি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। মালাক্কা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিংগাপুরের মধ্যে বিভক্ত। তাই এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, "আমাদের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও রক্ষণাত্মক চিন্তা করলে চলবে না, আক্রমণাত্মকভাবে চিন্তা করতে হবে।"

তবে এটি করতে হলে অবশ্যই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য প্রয়োজন। বর্তমানে এটি কেবল একটি প্রাথমিক ধারণা হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার। কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আঞ্চলিক সমন্বয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া

ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে সিংগাপুর ও মালয়েশিয়া। সিংগাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান বুধবার সকালে সিএনবিসির এক অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে জানান, মালাক্কা ও সিংগাপুর প্রণালির নৌপথ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং তারা এটি সীমাবদ্ধ করার কোনো প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে না।

তিনি বলেন, "এখানে জাহাজ চলাচলের অধিকার সবার আছে, এটি কোনো বিশেষ সুবিধা বা লাইসেন্স নয় যে এর জন্য টোল দিতে হবে।" তিনি আরো বলেন, এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন দ্বারা স্বীকৃত। সিংগাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তিনটি দেশই বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং এই নৌপথ উন্মুক্ত রাখা সবার স্বার্থেই জরুরি।

মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক মঙ্গলবার সিংগাপুরে অনুষ্ঠিত মেরিটাইম উইক ২০২৬-এ একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মালাক্কা প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক আইন এবং একটি নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা মেনে চলতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান তিনি।

এই বিতর্ক বিশ্ববাণিজ্যের ভবিষ্যৎ রুট ও নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পানামা খালের মতো মালাক্কা প্রণালিও আলোচনায় আসায় বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।