ঈদযাত্রায় জ্বালানি সংকটের শঙ্কা: পাম্পে রেশনিং, দীর্ঘ লাইন ও পরিবহন বন্ধের আশঙ্কা
ঈদযাত্রায় জ্বালানি সংকট: পাম্পে রেশনিং ও দীর্ঘ লাইন

ঈদযাত্রায় জ্বালানি সংকট: পাম্পে রেশনিং ও দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তির শঙ্কা

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। সরকার ইতোমধ্যে ঈদের ছুটির ঘোষণা দিয়েছে এবং বাস ও ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। যানজটের ভয়ে অনেকে বাড়ির পথে ছুটছেন। কিন্তু, এই সময়ে জ্বালানি তেল নিয়ে নতুন করে চিন্তা দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহকে প্রভাবিত করছে। সরকার উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনলেও, বাস্তবে পাম্পগুলোতে তেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

পাম্পে রেশনিং ও পরিবহন খাতের উদ্বেগ

জ্বালানি সংকটের জেরে সরকার পরিবহন খাতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যদিও সরকারি পর্যায় থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। তবে, বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পেট্রোল পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় পাম্পে নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দেওয়ার কারণে অনেক পরিবহন মালিক ও চালক প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

পরিবহন মালিকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, ঈদকে সামনে রেখে এই সময়ে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু, পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল না থাকলে পরিবহন চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে যাত্রী পরিবহনেও বিশাল সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, তাদের বহরের কয়েকটি বাস ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট ও পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে নির্ধারিত দিনে চলাচল করতে পারেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দূরপাল্লার বাস চলাচলে প্রভাব

জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতার প্রভাব ইতোমধ্যে দূরপাল্লার বাস চলাচলে পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন মালিকদের মতে, পাম্পে রেশনিং এবং দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক বাস সময়মতো জ্বালানি পাচ্ছে না, যা তাদের শিডিউল ব্যাহত করছে। বর্তমানে অনেক পাম্পে একসঙ্গে সীমিত পরিমাণ ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, ফলে দূরপাল্লার বাসের ট্যাংক পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে পথে অতিরিক্ত সময় নিয়ে জ্বালানি নিতে হচ্ছে, যা যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জয়েন্ট কনভেনার মিজানুর রহমান রতন বলেন, “আশঙ্কা তো থেকেই যাচ্ছে। সরকার মুখে বলছে তেলের সংকট নাই, কিন্তু বাস্তবে তো ৯ হাজার লিটার তেল চাইলে তেল দিচ্ছে চার লিটার। পাম্পে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। কারণ, আগে থেকেও অপেক্ষায় থাকা শত শত যানবাহন।” তিনি আরও যোগ করেন, “এ পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে তাহলে ঈদের লম্বা জার্নিতে ভোগান্তি হবার শঙ্কাই বেশি। সরকারের উচিত আজ-কালকের মধ্যেই এ বিষয় সমাধানে সিদ্ধান্ত নেওয়া।”

লঞ্চ ও সিএনজি খাতেও সংকটের আভাস

শুধু বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, লঞ্চ, স্টিমার ও স্পিডবোটের উপরেও চাপ পড়েছে। লঞ্চ মালিকরা জানিয়েছেন, তেল না পাওয়ায় গত কয়েক দিন ধরে অনেক লঞ্চ বা স্টিমার ছাড়া যাচ্ছে না, যা যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এতে চালক, সহকারী, টিকিট মাস্টার ও লাইনম্যানসহ প্রায় দেড় শতাধিক কর্মীও শঙ্কায় পড়েছেন।

এদিকে, সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারহান নুর বলেছেন, “এমনিতেই গ্যাসের চাপ কম পাই। এরপর ঈদের সময় একই অবস্থা থাকলে সংকট হবেই। গ্যাস সংকট কাটাতে বেশি দামে সরকার এলপিজি আমদানি করছে ঠিকই। কিন্তু, এখনও চাহিদা তুলনায় সরবরাহ কম।” তবে, এলপিজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ আপাতত অটোগ্যাস নিয়ে সংকট না দেখলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদী হলে এপ্রিলে শঙ্কা দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।

সরকারি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আজ শনিবার (১৪ মার্চ) জ্বালানি মন্ত্রণালয় রেশনিংয়ের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “কালকের (রবিবার) মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে ঈদের যাত্রা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার বলছে, তাদের সংকট নেই। কিন্তু, ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা রেশনিং করছে। অন্তত ঈদের সময় যাতে যাত্রীদের কোনও ভোগান্তি না হয়, সেটি বিবেচনা করে রেশনিং আপাতত বন্ধ করা উচিত।”

ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও মহাসড়কে যাত্রীদের চাপ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে চলমান আলোচনা এবারের ঈদযাত্রায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে ভোগান্তি চরম আকার নিতে পারে।