জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত পণ্য সরবরাহ, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের সরবরাহে মারাত্মক প্রভাব
জ্বালানি সংকটে পণ্য সরবরাহ বিপর্যস্ত, ওষুধ সরবরাহে প্রভাব

জ্বালানি সংকটে পণ্য সরবরাহে মারাত্মক বিপর্যয়

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে দেশে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না, কারণ জ্বালানি তেলের অভাবে তাদের যানবাহন রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এই সংকটে শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে, যা পুরো অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্য সংগঠনের উদ্যোগ

এই সংকট মোকাবিলায় গত দুই দিনে পণ্যভিত্তিক বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জরুরি অনুরোধ জানিয়েছে। তবে সরকারের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, ‘চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় আমাদের পণ্য সরবরাহ ১০ শতাংশের মতো কমে গেছে। এমনকি নদীপথে আসা অপরিশোধিত লবণ কারখানায় নেওয়ার জন্য ভাড়ায় ট্রাকও পাওয়া যাচ্ছে না।’ এই অবস্থা বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর প্রভাব

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমাদের সাড়ে তিন হাজার ট্রাকের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এখন অলস পড়ে আছে, কারণ ডিপো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি আরও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একইভাবে, ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স বাণিজ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো নিজস্ব পরিবহনের অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছে না এবং ভাড়া গাড়িও পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।

ওষুধ শিল্পের উপর মারাত্মক প্রভাব

জ্বালানি সংকটে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় আছেন ওষুধশিল্পের মালিকেরা। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি জ্বালানিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে ফিলিং স্টেশনে ওষুধ পরিবহনে নিয়োজিত গাড়িতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি তেল সরবরাহের সীমা শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছে।

ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘কারখানা থেকে গুদাম এবং গুদাম থেকে দোকানে ওষুধ পৌঁছাতে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। রাতের বেলায় সিরিয়াল দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। এভাবে চলতে থাকলে ওষুধ সরবরাহে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।’

রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলোও এই সংকটের মুখোমুখি। ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বয়লার ব্যবহার করে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা এই শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সংকটে কারখানাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না, ফলে লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ঈদের আগে সব কারখানার পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণে বাড়তি চাপ থাকে। এখনই জ্বালানি সরবরাহে উদ্যোগ নেওয়া না গেলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

সমাধানের পথ কী?

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক সংকটে সবার ওপরই কমবেশি প্রভাব পড়েছে বা পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়, এ বাস্তবতা সবাইকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’ তবে তিনি পরামর্শ দেন, সরকার জ্বালানি দেওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, যা সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

এই সংকটের পেছনে বৈশ্বিক প্রভাবও দায়ী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও এই সংকটের আশঙ্কায় মানুষ পেট্রলপাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।