গুলশানে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ: ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি ও প্রকল্পের পতন
গুলশানে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ, ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি

গুলশানে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ: ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি ও প্রকল্পের পতন

গ্রীষ্মকালে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে রাজধানীর গুলশানবাসীকে মুক্তি দিতে দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই স্বপ্নের প্রকল্পটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ব্যয়বহুলতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় সমস্যার কারণে প্রকল্পটি থেকে সরে আসছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

প্রকল্পের পটভূমি ও বন্ধের কারণ

২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ৫ বছরে 'ঢাকার গুলশানে ১৩২/৩৩/১১ কেভি ভূগর্ভস্থ গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ' প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ও সরকারি তহবিলে এই প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৯৬ শতাংশ বেশি দাম দাখিল করেন ঠিকাদাররা, যা প্রকল্পকে বিপাকে ফেলে দেয়।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, "মাটির নিচে নির্মাণ কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) বিপাকে পড়ে। এ কারণে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।" প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৮.১৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ১০.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নগণ্য।

আর্থিক ক্ষতি ও সংশোধন প্রক্রিয়া

প্রকল্প বন্ধের কারণে ইতোমধ্যে ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে, যা মূলত পরামর্শকদের বেতন ও ডিজাইনের পেছনে খরচ করা হয়েছে। এই টাকার বিস্তারিত হলো:

  • জাইকার ঋণ থেকে ৪২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা
  • সরকারি তহবিল থেকে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা
  • ডেসকোর নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা

২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় মোট ৭৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রকল্প বন্ধের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর প্রথম প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয় এবং ১১টি সুপারিশ দেওয়া হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়ে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

ভবিষ্যত সতর্কতা ও সুপারিশ

দ্বিতীয় পিইসি সভায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিনিধি সতর্ক করে বলেন, "জাইকার ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই বৈদেশিক ঋণে প্রকল্প নিতে সচেতন থাকতে হবে।" সভার সভাপতি মোখলেস উর রহমান যোগ করেন, "ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তিঘন ও ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যথাযথভাবে করতে হবে এবং যৌক্তিক ব্যয় প্রাক্কলন নিশ্চিত করতে হবে।"

প্রকল্প পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, ৪টি অডিট আপত্তির মধ্যে ২টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বাকি দুটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা ও সুশাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।