এক হাতে হাতুড়ি, আরেক হাতে কাস্তে। পেছনে পরিত্যক্ত ১৮ শতাংশ ভূমি। পরিত্যক্ত জায়গাটিতে ছিল রানা প্লাজা নামের নয়তলা ভবন। সেখানে ছিল কয়েকটি পোশাক কারখানা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজার কারখানায় কাজ শুরু করেছিলেন শ্রমিকরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দে ধসে পড়ে পুরো ভবন। সৃষ্টি হয় এক নির্মম ইতিহাস। প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৫ জন শ্রমিক। সে ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনও সেদিনের স্মৃতি বহন করছেন অনেকে। অনেকের জীবন কাটছে জীবন্ত লাশ হয়ে। সেদিনের ক্ষত এখনও দগদগে তাদের হৃদয়ে।
ঘটনার স্মৃতি ও বর্তমান অবস্থা
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার নথিপত্রের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হন। ফিরে দেখাঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিল রানা প্লাজা। ভবনের প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান। দ্বিতীয় তলায় দোকান ও ব্যাংকের শাখা। তৃতীয় থেকে সপ্তম তলাতে ছিল পোশাক কারখানা। এর মধ্যে তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে এবং ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেড, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড গার্মেন্টস। অষ্টম ও নবম তলা ছিল ফাঁকা। সেদিন সকালে ভবনে কাজ করছিলেন প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক। সকাল ৮টার দিকেই কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছিল। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দে প্রথম তলার ওপরে পুরো ভবন ধসে পড়ে। এর পরই শুরু হয় উদ্ধারকাজ। শুরুতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় লোকজন। দ্রুত সময়ে উদ্ধারকাজে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র্যাব ও পুলিশ।
এমন ইতিহাসের জন্ম নাও হতে পারতো
ধসের একদিন আগেই ওই ভবনের চার ও পাঁচতলার কয়েকটি পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এ কারণে শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। খবর পেয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা সেখানে যান। তবে মালিক কর্তৃপক্ষ সংবাদকর্মীদের ভবনে প্রবেশ করতে দেয়নি। তারা যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশ হয় সংবাদমাধ্যমে। বিকালের দিকে ওই সময়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কবির হোসেন সরদার ভবনের ফাটল পরিদর্শন করেন। এরপর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের বলেন, ‘এই ফাটলে তেমন কোনও সমস্যা নেই। বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নেই। সামান্য প্লাস্টার উঠে গেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এরপর ইউএনও চলে যান। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভবন ধসের সাক্ষী হয় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব। প্রাণ হারান হাজারো শ্রমিক। ঘটনার পরই ওই ইউএনওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আহত শ্রমিক, শ্রমিকনেতা ও সুশীল সমাজের দাবি, প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিলে ঘটনা এড়ানো যেতো।
অধরচন্দ্রের মাঠ এখনও বয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি
ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে একে একে উদ্ধার হতে থাকে জীবিত, আহত, মৃত মানুষের দেহ। আহতদের নেওয়া হয় আশপাশের হাসপাতালে। মৃতদের দেহ নেওয়া হয় সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে। টানা ১৭ দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হতো ওই মাঠে। লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা ছুটে আসতেন সাইরেন শুনলেই। এই বুঝি স্বজনের মরদেহ এলো। স্বজনদের আহাজারিতে দিনরাত ভারী হয়ে থাকতো অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ। প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের পুরোটা জুড়েই তখন কান্না আর সাইরেনের আওয়াজ। অধরচন্দ্রের ওই মাঠ এখনও বয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি। ওই সময় স্কুলটিতে পড়তেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘আগে ক্লাসের বাইরে প্রচুর ঘোরাফেরা, খেলাধুলা করতাম এই মাঠে। কিন্তু রানা প্লাজার ধসে পড়ার পর মৃত লাশগুলো সারি সারি করে রাখা হয়েছিল এখানে। এখনও মাঠে গেলে গা ছমছম করে ওঠে।’
সেদিনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন আহতরা
আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিককে। আহতদের অনেকেই এখনও দুর্বিষহ সেদিনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু। এখনও সেদিনের স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।
শহীদ বেদি এখন ‘প্রতিবাদের প্রতীক’
শ্রমিকদের স্মরণে ২০১৩ সালের ২৪ মে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি শহীদ বেদি নির্মাণ করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। অস্থায়ী শহীদ বেদির নামকরণ করা হয় ‘প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।’ বেদিটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন চালিয়ে আসছে নানা আন্দোলনের কর্মসূচি। এটি এখন হয়ে উঠেছে ‘প্রতিবাদের প্রতীক।’
যেমন আছে রানা প্লাজার সেই স্থান
ধসের পরপরই প্রায় সব ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এরপর জমিটির চারপাশ কাঁটাতার ও টিনের বেড়া দিয়ে রাখা হয়েছিল। ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই রানা প্লাজায় আহত, নিহত আর নিখোঁজ স্বজনরা জায়গাটিতে আসতেন। তবে ধীরে ধীরে জায়গাটি পরিণত হয় পরিত্যক্ত ভূমিতে। বর্তমানে জায়গাটিতে নানা লতাপাতার দখল। সামনে বেদি। ফুটপাতজুড়ে রাখা থাকে রেন্ট-এ কারের গাড়ি। তবে ২৪ এপ্রিল এলে নানা কর্মসূচিতে কিছুটা প্রাণ পায় জায়গাটি।
বিচার পাননি তারা
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তিনটি মামলার কোনোটিই এখনও শেষ হয়নি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইনে দায়ের করা মামলাটি দীর্ঘদিন হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে আছে। এটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের করা মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে দুদকের করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে হাজারো শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ওই ঘটনায় এখনও কোনও বিচার পাননি হতভাগ্য শ্রমিকরা।
আহতদের বাঁচার লড়াই
১৩ বছর ধরে পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছেন আহত অনেকে। অসুস্থতা আর দারিদ্র্য নিয়ে তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম। কেউ তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। শ্রমিকনেতারাও রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ দোষীদের শাস্তি ও শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন এতদিন। চারতলায় একটি কারখানায় কাজ করতেন মনোয়ারা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২৩ এপ্রিল আমরা দেখলাম ভবনে ফাটল দেখা যায়, তখন আমাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। ২৪ তারিখ সকালে সবাইকে আবার বলা হয় যে ফাটল দেখা গেছে, তাই ঢুকতে হবে না। কিন্তু পরে আমাদের জোর করে কাজের জায়গায় ঢোকানো হয়। আমরা তখন কাজ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে একটি বড় শব্দ হয়, চারদিক কেঁপে ওঠে। মনে হলো সব হঠাৎ ভেঙে পড়ছে। মাথার ওপর ধুলা পড়ে চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। আমি আর কিছু বুঝতে পারিনি, কী হয়েছে। এরপর প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমার মাথায় আঘাত লেগেছে, বুকে চাপ লেগেছে, কোমরে সমস্যা হয়েছে, হাত কেটে গেছে। পরে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অনেক পরে জ্ঞান ফিরে এসেছিল।’ দুর্বিষহ অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন অবস্থাটা এমন যে আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারি না। ডাক্তার বলেছেন ভারী কোনও কাজ করা যাবে না। এমনকি দুই কেজির বেশি ওজনও তুলতে পারবো না। বসে বা টুলে বসে কাজ করতে হবে। মাথার সমস্যাও রয়ে গেছে, সময়ের হিসাবও অনেক সময় গুলিয়ে যায়। আমাকে কিছু সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল। বিকাশে ১৫ হাজার করে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল, পরে আবার কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু তা হাতে পাইনি। কাগজপত্রে জিরো-জিরো দেখানো হয়েছে। চিকিৎসার সময় বলা হয়েছিল, কিছু টাকা সরকার দিয়েছে। কিন্তু আমরা তার সঠিক হিসাব পাইনি। এখন আমার একটাই দাবি, যেহেতু আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারি না, আমাদের পুনর্বাসন করা হোক। আমাদের এমন কোনও ব্যবস্থা করা হোক যেখানে আমরা কাজ করে খেতে পারি। আমরা বহু বছর ধরে এসব কথা বলছি, বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথার কেউ সাড়া দিচ্ছে না।’
রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় প্যান্টম টেক্স লিমিটেডে চাকরি করতেন জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি রানা প্লাজার পাঁচ তলায় কাজ করতাম। ফ্যাক্টরির নাম প্যান্টম টেক লিমিটেড। ভাঙনের দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমাকে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। এখন আমি অনেক অসুস্থ অবস্থায় আছি। ভাঙনের সময় আমার মাথায় লোহার কিছু পড়ে আঘাত লাগে। এতে মাথার ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। সেই থেকে সারাক্ষণ মাথায় যন্ত্রণা থাকে। অনেক সময় চিৎকার করে উঠি। আমি পিজি হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছি। কিন্তু এখনও পুরোপুরি সুস্থ হইনি। আমার বুকে আঘাত লেগে বাম পাশের ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, জরুরি অপারেশন করতে হবে। কিন্তু অর্থের অভাবে করাতে পারছি না। মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে, কোমর এবং ডান পায়ের হাড়েও সমস্যা আছে। আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। আধা ঘণ্টা বসে থাকতেও পারি না। খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছি।’ আমি এখন টানাপোড়েনের মধ্যে বেঁচে আছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওষুধ খাচ্ছি, চিকিৎসা চলছে। কিন্তু আগের মতো স্বাভাবিক জীবন আর নেই। মনে হয়, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো ছিল। আমার একটা ১২ বছরের ছেলে আছে। ভাঙনের পর আমাদের কিছু সাহায্য হিসেবে বিকাশে টাকা দেওয়া হয়েছিল-প্রায় ৯৫ হাজার টাকা। কয়েক দফায় ১৫ হাজার করে এবং একবার ৫০০ টাকা। কিন্তু ৫০০ টাকা পরে সরকার কেটে নিয়েছে বলে শুনেছি। আমার স্বামী এখনও নিখোঁজ। তার কোনও খোঁজ নেই। আমি এখন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। একবেলা খাই, আরেকবেলা খেতে পারি না। ছেলেকে ভালো খাবার বা ভালো কাপড় দিতে পারি না। ঈদ বা বিশেষ দিনেও কিছু দিতে পারি না। নিজের বাঁচাটাই এখন কঠিন হয়ে গেছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি চিন্তায় আছি। আমি কোনও সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। এখন সরকারের কাছে আমার দাবি, আমাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা আহত হয়েছি তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে। আমার ছেলের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। যাতে সে মানুষ হিসেবে বড় হতে পারে। নিজে কোনও কাজ করতে পারি না। খেতে পারি না। মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হয়। তাই আমার একটাই প্রশ্ন-আমার সন্তানকে কে দেখবে, তাকে কে মানুষ করবে।’
যা বলছেন শ্রমিকনেতারা
রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি শ্রমিক সংগঠনই নড়েচড়ে বসে। শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশ নিরাপদ রাখতে আন্দোলন শুরু করেছিল। নিহত ও আহতদের লস অব আর্নিংয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করার জোর দাবি তোলেন তারা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এতে এক হাজারের বেশি শ্রমিক প্রাণ হারান এবং দুই হাজারের বেশি শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সুচিকিৎসা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। অনেক ভুক্তভোগী এখনও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত। আমাদের দাবি হলো, অবিলম্বে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনরায় বিস্তারিত মূল্যায়ন বা নিড অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে রানা প্লাজার ঘটনায় জড়িত ভবন মালিক, গার্মেন্টস মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
একই দাবি করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রিয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার চোখের সামনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এ ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত হন। প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন শ্রমিক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ শ্রমিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত। দুঃখজনকভাবে এ ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও দায়ী ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া আর অধিকাংশ অভিযুক্ত এখনও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিপূরণ ও বিচার দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে এককালীন আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক ভুক্তভোগী শ্রমিক এখনও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি। কিছু সহায়তা বা অনুদান দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।’ শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি হলো-দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে রানা প্লাজার সামনে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে, যাতে নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায়। আমরা ২৪ এপ্রিলকে গার্মেন্টস শ্রমিক শক্তি দিবস হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানাই। এ ছাড়া আহত ও নিহত শ্রমিকদের এককালীন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ, পঙ্গুত্ববরণকারীদের আজীবন চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। রানা প্লাজার জায়গাটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে সেখানে শ্রমিকদের স্মৃতিস্তম্ভ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করা হোক-এটাই আমাদের দাবি। বর্তমানে ওই জায়গার অবস্থা অরক্ষিত ও অস্বাস্থ্যকর। আমরা চাই, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জায়গাটি সংরক্ষণ করুক এবং শ্রমিকদের সম্মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করুক।’
১৩ বছরে শ্রমিকদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো পর্যাপ্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যাপ্ততার কোনও ডেফিনেশন নেই। তাই একেবারে সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির জায়গাটাও আপেক্ষিক। রানা প্লাজা ঘটনার সময়ের তুলনায় আজ শ্রমিকদের বেতন, জীবনমান ও সামাজিক সাপোর্ট অনেক বেড়েছে যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে তাদের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সেই সময়ের তুলনায় গার্মেন্টস শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, প্রতিযোগিতা এবং মুনাফার চাপের কারণে অনেক মালিকও এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছেন।’ মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘শুধু শ্রমিকদের দিক থেকে বিষয়টি দেখা ঠিক নয়, আবার একপাক্ষিকভাবে মালিকদের পক্ষেও অবস্থান নেওয়া উচিত নয়। শ্রমিকদের জীবনমান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও রপ্তানি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। একটা সময় টিশার্টের দাম যেমন ছিল, আজও বৈশ্বিক বাজারে সেই দাম কমে গেছে বা স্থবির আছে। অথচ শ্রমিকদের ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য মালিক, শ্রমিক, সরকার এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা- সব পক্ষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। বায়ারদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, সরকারের প্রয়োজন অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং মালিকদেরও লাভজনক অবস্থায় থাকতে হবে, তাহলেই শ্রমিকদের জন্য আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে একপাক্ষিক নয়, বরং ব্যালেন্সিং মাইন্ডসেট প্রয়োজন, যেখানে সব পক্ষের স্বার্থ ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে।’



