ঢাকা সবসময়ই তাঁর কাছে টানে, আর সেই টান যে প্রাণের—তা আবারও প্রমাণিত হলো। পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাঁধন আছে প্রাণে প্রাণে’ সংগীত সন্ধ্যায় অংশ নিয়ে নিজের মুগ্ধতা এভাবেই প্রকাশ করলেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। অনুষ্ঠানের রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল ২২ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি একে অভিহিত করেছেন এক অনন্য ‘সুখস্মৃতি’ হিসেবে।
অনুষ্ঠানের বিবরণ
গত ১৭ ও ১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গুলশানের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার (IGCC) প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গী হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পী অদিতি মহসিন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শ্রীকান্ত আচার্য লিখেছেন, “বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা শিল্পী অদিতি মহসিন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমাদের দ্বৈত ও একক গানের মধ্য দিয়ে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আমি আরও একবার গভীরভাবে অনুভব করলাম।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের শীতলতার প্রভাব সরাসরি পড়েছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দীর্ঘদিন কোনো ভারতীয় শিল্পী বাংলাদেশে পারফর্ম করতে আসেননি। অন্যদিকে, মব সংস্কৃতির কবলে পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। একের পর এক কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া, বাউল ও লোকজ শিল্পীদের ওপর হামলা এবং শিল্পকলা একাডেমির মতো জায়গায় নাটক প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনায় শিল্পীদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছিল।
পূর্ববর্তী ঘটনা
গত ডিসেম্বরে ওস্তাদ রশিদ খানের পুত্র আরমান খান বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও এই অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে সফর বাতিল করেন। একইভাবে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোর কড়াকড়ির কারণে বাংলাদেশের শিল্পীদের ওপারে যাতায়াতও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। দুই বাংলার আকাশে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ক্ষেত্রে যে এমন গুমোট মেঘ জমেছিল, প্রথিতযশা শ্রীকান্ত আচার্যের উপস্থিতিতে কি তবে সেই মেঘ কাটতে শুরু করেছে—এমন প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে।
উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা
আয়োজনটিতে কেবল সংগীত নয়, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের উপস্থিতি বিষয়টিকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদি আমিন, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী মো. মাহবুব উর রহমানসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা।
হাই কমিশনারের বক্তব্য
হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন জাতীয় সীমানার চেয়েও প্রাচীন ও গভীর। একই মঞ্চে দুই দেশের দুই নক্ষত্রের উপস্থিতি সেই পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধারই প্রতীক। শ্রীকান্ত আচার্য তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, আয়োজকদের বক্তব্যেও বাংলা সংস্কৃতির মানবিকতা আর বিশ্বজনীনতার কথা উঠে এসেছে যা তাঁকে স্পর্শ করেছে।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
শিল্পীদের অবাধ যাতায়াত ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে আবারও দুই বাংলা সুরের সুতোয় বাঁধা পড়বে—এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে এখন সেই প্রত্যাশাই দেখছেন সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টরা। শ্রীকান্ত আচার্যের এই সফর দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও শিল্পী বিনিময় ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করতে পারে।



