কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন, যিনি গত এপ্রিলে আর্টেমিস–২ অভিযানের মাধ্যমে চাঁদের পথে পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন, তিনি আগামী সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণকালীন মহাকাশচারীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (সিএসএ) এই নভোচারী ৬ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, এই সিদ্ধান্তকে যেন কেউ তাঁর চিরকালের বিদায় মনে না করে। তিনি আসলে রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ারফোর্সের একজন রিজার্ভিস্ট সদস্য হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন।
নতুন পেশাগত পথে হ্যানসেন
হ্যানসেন বলেন, মহাকাশ নিয়ে কানাডায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে, সেগুলোকে নতুন ও সৃজনশীল উপায়ে সাহায্য করার জন্য তিনি ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিএসএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হ্যানসেন জীবনের এক নতুন পেশাগত সুযোগ বেছে নিচ্ছেন। মহাকাশ সংস্থাটি তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের প্রশংসা করে বলে, ‘সিএসএ, নাসা ও অন্যান্য সহযোগীর সঙ্গে কাজ করে হ্যানসেন মহাকাশ গবেষণায় কানাডার জন্য এক ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায় তৈরি করেছেন। তিনি দেশের তরুণদের মনে মহাকাশ জয় করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও ভবিষ্যতে নিজেদের মহাকাশ অভিযানে দেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।’
তবে এই দায়িত্ব ছাড়ার পর হ্যানসেন ঠিক কী ধরনের নতুন কাজে যোগ দেবেন, সে বিষয়ে তিনি নিজে বা মহাকাশ সংস্থা কেউই এখনো পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। হ্যানসেন চাকরি ছাড়ার পর কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সিতে এখন তিন নভোচারী ডেভিড সেন্ট-জ্যাক, জোশুয়া কুট্রিক এবং জেনি গিবন্স থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে হ্যানসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘কানাডার প্রতি কর্নেল জেরেমি হ্যানসেনের অসাধারণ সেবা ও মহাকাশ গবেষণায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য সব নাগরিকের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর ফাইটার পাইলট হিসেবে চমৎকার কর্মজীবন ও আর্টেমিস–২ মিশনের মাধ্যমে ইতিহাস গড়ার প্রশংসা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যানসেন লিখেছেন, ‘৩২ বছরের সামরিক সেবা ও সিএসএতে ১৭ বছর নভোচারী হিসেবে কাজ করার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যার শেষ উপহার ছিল আর্টেমিস–২-এ চড়ে চাঁদের চারপাশে ওড়ার এক অবিশ্বাস্য সুযোগ।’
আর্টেমিস–২ মিশনের ঐতিহাসিক অর্জন
গত এপ্রিলে আর্টেমিস–২ অভিযানে একমাত্র আন্তর্জাতিক নভোচারী হিসেবে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন হ্যানসেন। গত ৫০ বছরের মধ্যে সেটিই ছিল চাঁদের কাছাকাছি মানুষের প্রথম যাত্রা। এই অভিযানে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন, যা মহাকাশে মানুষের সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের এক নতুন রেকর্ড।
চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার এই রোমাঞ্চকর অভিযানে হ্যানসেনের সঙ্গে ছিলেন নাসার আরও তিন নভোচারী। অভিযানের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, গভীর মহাকাশে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি ভিক্টর গ্লোভার এবং চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করা ইতিহাসের প্রথম নারী মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কোচ।
অভিযানের মানবিক দিক
দীর্ঘ ১০ দিনের এই অভিযানে নভোচারীরা মাত্র সাড়ে ১৬ ফুট চওড়া ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে একসঙ্গে ছিলেন। মহাকাশ থেকে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের সময় হ্যানসেন এক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, চাঁদের একটি গর্তের নাম তাঁরা কমান্ডার ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারলের নামে রাখতে চান। এটিই ছিল এই মিশনের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। পৃথিবীতে ফিরে এসে হ্যানসেন জানান, এই পুরো অভিযান তাঁদের সবার জন্য ছিল এক দারুণ মানবিক অভিজ্ঞতা; আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যেভাবে তাঁদের এই রোমাঞ্চের সঙ্গী হয়েছিল, তা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
নিজের দলের কাজের পরিবেশ নিয়ে হ্যানসেন বলেন, ‘আমাদের ক্রুদের মধ্যে একটা মজার শব্দ চালু আছে, ‘আনন্দের ট্রেন’। আমরা সব সময়ই যে খুব হাসিখুশিতে থাকি, তা নয়। মাঝেমধ্যে কাজের চাপে মন খারাপও হয়; কিন্তু আমরা খুব দ্রুতই আবার সেই আনন্দের ট্রেনে চড়ে বসার চেষ্টা করি। যেকোনো বড় লক্ষ্য পূরণে কাজ করা দলের জন্য এটি একটি দারুণ জীবনমুখী শিক্ষা।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস–২ মিশনের পর এবার আর্টেমিস–৩ মিশন পরিচালনা করা হবে। এই অভিযানে নাসার ওরিয়ন ক্যাপসুল কীভাবে মহাকাশে একটি লুনার ল্যান্ডারের (চাঁদে নামার যান) সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তা পরীক্ষা করা হবে। সব ঠিক থাকলে এই কর্মসূচির অধীন চাঁদের মাটিতে মানুষের পা রাখার ঐতিহাসিক আর্টেমিস–৪ মিশনটি ২০২৮ সালের মধ্যেই উৎক্ষেপণ করা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান হ্যানসেনের প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘হ্যানসেন অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নভোচারী হওয়ার জন্য তিনি বছরের পর বছর কঠোর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। যখন তিনি আর্টেমিস–২–এর ক্রু হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন তিনি নিজের কাজ নিখুঁত ও পেশাদারত্বের সঙ্গে শেষ করেন।’



