চার্লস ডি কেটেলার: নীরব জাদুকরের উত্থান বেলজিয়ামের নতুন আশা
চার্লস ডি কেটেলার: নীরব জাদুকরের উত্থান

বেলজিয়ামের তরুণ ফুটবলার চার্লস ডি কেটেলার ২০২৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে জোড়া গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে ম্যাচসেরা হয়েছেন। তিনি বর্তমানে বেলজিয়ামের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

২০০১ সালের ১০ মার্চ বেলজিয়ামের ঐতিহাসিক শহর ব্রুজে জন্ম নেওয়া ডি কেটেলারের শৈশব কেটেছে ফুটবলকে ঘিরেই। খুব অল্প বয়সেই তিনি ক্লাব ব্রুজের একাডেমিতে যোগ দেন এবং সেখানেই আধুনিক ফুটবলের প্রতিটি সূক্ষ্মতা শেখেন।

ক্লাব ক্যারিয়ার

ক্লাব ব্রুজের জার্সিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তার বেশি সময় লাগেনি। লিগ শিরোপা, সুপার কাপ এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আনে। এরপর তিনি ইতালির এসি মিলানে পাড়ি জমান। প্রথম অধ্যায়টি প্রত্যাশামতো না হলেও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং ব্যর্থতাকে নিজের শিক্ষক বানিয়েছেন। পরে আতালান্তায় যোগ দিয়ে নতুন করে নিজের পরিচয় খুঁজে পান। সিরি আ-তে গোল, অ্যাসিস্ট এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করেন যে বড় মঞ্চে খেলার জন্যই তার জন্ম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাতীয় দলে উত্থান

জাতীয় দলের জার্সিতেও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন ডি কেটেলার। কেভিন ডি ব্রুইন, রোমেলু লুকাকুদের অভিজ্ঞতার পাশে নতুন প্রজন্মের মুখ হিসেবে এখন তাকেই দেখছে বেলজিয়াম। চলতি বিশ্বকাপই তার ক্যারিয়ারের নতুন পরিচয় লিখে দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স

গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচেই আক্রমণভাগে সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন ডি কেটেলার। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে সুযোগ তৈরি, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে আক্রমণের নেতৃত্ব এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে ধৈর্যশীল ফুটবলে ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ। রাউন্ড অব ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে ৩–২ গোলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তবে আসল বিস্ফোরণ ঘটে শেষ ষোলোয়। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪–১ গোলের দুর্দান্ত জয়ে জোড়া গোল করে ম্যাচের ভাগ্য একাই প্রায় নির্ধারণ করে দেন। সঙ্গে ছিল একটি অ্যাসিস্ট। তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন তিনি। টুর্নামেন্টজুড়ে তার পরিণত ফুটবল, গোল করার ক্ষমতা এবং আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা বেলজিয়ামকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

খেলার বিশেষত্ব

ডি কেটেলারের বিশেষত্ব শুধু গোলে নয়। ম্যাচের ছন্দ বদলে দিতে পারেন একটি পাসে, একটি টাচে কিংবা একটি বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্টে। লম্বা গড়ন, অসাধারণ প্রথম স্পর্শ, দুই পায়েই বল নিয়ন্ত্রণ এবং খোলা জায়গা তৈরি করার দক্ষতা তাকে আধুনিক ফুটবলের সম্পূর্ণ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

উদ্ধৃতি

নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে ডি কেটেলার বলেন, 'বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের জার্সি গায়ে প্রতিটি ম্যাচই আমার কাছে স্বপ্নের মতো। ব্যক্তিগত গোল বা অ্যাসিস্টের চেয়ে দলের জয়ই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, এই দল অনেক দূর যেতে পারে। এখন আমাদের লক্ষ্য শুধু পরের ম্যাচ, কারণ নকআউটে একটি ভুলই সব স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের দলে অভিজ্ঞতা ও তরুণদের ক্ষুধা দুটোই আছে। রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনের মতো খেলোয়াড়দের পাশে খেলতে পারাটা আমার জন্য বড় সৌভাগ্য। তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি। এই শেখার প্রক্রিয়াই আমাকে আরও ভালো ফুটবলার হতে সাহায্য করছে।'

প্রশংসা

বেলজিয়ামের কোচ তার প্রশংসায় বলেন, 'চার্লস ম্যাচকে খুব ভালোভাবে পড়তে পারে। সে কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন খেলা থামাতে হবে সবকিছুই বুঝতে পারে। বড় ম্যাচে এমন ফুটবলারই পার্থক্য গড়ে দেয়।'

সতীর্থ কেভিন ডি ব্রুইনের মতে, 'চার্লসের মধ্যে ভবিষ্যতের একজন বড় ফুটবলারের সব গুণ আছে। সে সবসময় শেখার চেষ্টা করে, উন্নতির চেষ্টা করে। এই মানসিকতাই তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।'

মাঠের বাইরে

মাঠের বাইরেও ডি কেটেলার একেবারেই ভিন্ন মানুষ। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাকচিক্যের চেয়ে অনুশীলনের মাঠই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিনয়, শৃঙ্খলা এবং নিরলস পরিশ্রমই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

ফুটবলের ইতিহাস বলে, বড় তারকারা শুধু প্রতিভা নিয়ে জন্মান না, তারা প্রতিদিন নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলেন। চার্লস ডি কেটেলার সেই পথেই হাঁটছেন। আজ তিনি বেলজিয়ামের নতুন আশা, আর আগামী দিনে হয়তো ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। মাঠে তার প্রতিটি ছোঁয়ায় যেন লুকিয়ে থাকে একটি বার্তা, নীরবতারও নিজস্ব এক শক্তি আছে, সেই শক্তিই একদিন ইতিহাস হয়ে ওঠে।