মিলি আক্তারের অভিষেক ম্যাচ: চীনের বিপক্ষে সেভে আলোচনায়
বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের গোলকিপার মিলি আক্তার চীনের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। সিডনি অপেরা হাউসে ঘুরে বেড়ানো তার দিনটি খুব ভালো কেটেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মিলি আক্তার বলেন, "আত্মবিশ্বাস ছিল, সুযোগ পেলে ভালো করব। মনে কিছুটা ভয় কাজ করলেও আস্তে আস্তে তা কাটিয়ে উঠি।"
প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংজ্ঞা ও পার্থক্য
২০২৪ সালে ভুটানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেললেও মিলি আক্তার কালকের চীন ম্যাচকে তার প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "ভুটানের সঙ্গে ৬০ মিনিট খেলেছিলাম, তবে ওটা ছিল প্রীতি ম্যাচ। আর কালকেরটা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। সে জন্যই বলা।"
গোলকিপার হওয়ার পেছনের গল্প
ছোটবেলায় প্রাইমারি স্কুলে ছেলেদের সঙ্গে খেলার সময় কেউ গোলকিপার হতে চাইত না, তখন মিলি আক্তার গোলকিপার হিসেবে দাঁড়াতেন। একবার পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়ার পর থেকেই তিনি গোলকিপার হিসেবে খেলা শুরু করেন। তিনি বলেন, "আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি করছি এবং ওখানকারই গোলকিপার।"
ক্যাম্প থেকে বাদ পড়া ও ফিরে আসার সংগ্রাম
বাফুফের ক্যাম্প থেকে এক বছর বাদ পড়েছিলেন মিলি আক্তার। তিনি বলেন, "পারফরম্যান্স খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে ক্যাম্প থেকে বাদ পড়েও কখনো হাল ছাড়িনি। ছাড়িনি বলেই ২০২৪ সালে ডাক পেয়ে ভুটানে খেলতে যাই।" এই সময়টাকে তিনি হতাশার হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চৌরাস্তা এলাকায় বাড়িতে ফিরে যান। সেখানকার পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট খেলে তিনি উঠে আসেন।
পরিবার ও আর্থিক সংগ্রাম
মিলি আক্তারের পরিবারে চার বোন আছেন, কোনো ভাই নেই। তিনি সবার ছোট। তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তার বাবা শামসুল হক আগে ধানের ব্যবসা, কলার চাষ, গরু কেনাবেচাসহ অনেক কাজ করতেন। বাবার বয়স ৫০ বছরের বেশি হওয়ায় তিনি তাকে আর কাজ করতে দেন না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। মিলি আক্তার বলেন, "বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে ফুটবল মাঠে যাতায়াতের জন্য দিনে ২০ টাকা করে দিতেন। কোনো সময় ক্লাস করতাম, আবার করতাম না। মাঠে প্র্যাকটিস শেষে সবাই নাশতা খেলেও আমি খেতাম না। আমার কাছে টাকা থাকত না।"
খেলোয়াড় হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা
তাদের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বড় সমস্যা রয়েছে। রাস্তা এতই সরু যে কোনো অসুস্থ মানুষকে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই, গাড়িও ঢোকে না। বাড়ি থেকে প্র্যাকটিস করতে পারছিলেন না বলে তারা ভাড়াবাড়িতে উঠেন। মিলি আক্তার বলেন, "সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমাদের বাড়ির রাস্তা এবং বাসার সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তো এখন নেই।"
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও অনুপ্রেরণা
২০২৪ সালে নেপালে সিনিয়র সাফজয়ী দলে ছিলেন মিলি আক্তার। গত বছর ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে সেরা গোলকিপার হয়েছেন। এবার এশিয়ার মঞ্চ মাতালেন প্রথম ম্যাচে। তার সামনের লক্ষ্য হলো আস্তে আস্তে আরও বড় হওয়া। তিনি বলেন, "জাতীয় দলে টিকে থাকার স্বপ্ন দেখি। খেলাটা ধরে রাখতে কঠোর পরিশ্রম করব। আগামী ম্যাচে সুযোগ পেলে আশা করি আর ভয় লাগবে না।" ম্যাচ শেষে রুপনা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, "ভালো খেলছ", এবং উৎসাহ দিয়েছেন অনেক।
পরিবারের সমর্থন
মিলি আক্তারের বাবা-মা একা থাকেন। তাদের বাড়িতে টেলিভিশন নেই, তাই বাবা একটি অফিসে গিয়ে খেলা দেখেছেন। তিনি ছোটবেলা থেকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং এখন সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেন। তার এই পর্যায়ে আসার পেছনে পরিবারের সমর্থন ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।



