রিয়াল মাদ্রিদের শিরোপা স্বপ্নে বাধা: ৫টি কারণ বিশ্লেষণ
রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান মৌসুমটি আশানুরূপ যাচ্ছে না। লা লিগায় শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার চেয়ে ৭ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে তারা লিগ শিরোপা-দৌড় থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালেও বায়ার্ন মিউনিখের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। কোচ আলভারো আরবেলোয়ার কথায়, ‘খেলোয়াড়দের বোঝানো কঠিন যে ২০০ শতাংশ না দিলে জেতা যাবে না।’ পরিসংখ্যানও বলছে, রিয়াল নিজেদের সেরাটা উজাড় করে খেলছে না। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচে হার এবং আরবেলোয়ার অধীনে ১৮ ম্যাচে ৫ হার—এই সংখ্যাগুলো উদ্বেগজনক।
১. এমবাপ্পের গোল খরা: তারকা ফরোয়ার্ডের নিষ্ক্রিয়তা
কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি মৌসুমে ৩৮ গোল করেছেন, তিনি এখন রিয়ালের জন্য সমাধান নয় বরং সমস্যার অংশ হয়ে উঠছেন। সর্বশেষ গোল করেছেন ৮ ফেব্রুয়ারি, যা দীর্ঘ সময় ধরে গোলশূন্য থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মজার বিষয় হলো, আরবেলোয়ার অধীনে রিয়াল এমবাপ্পেকে ছাড়াই টানা পাঁচ ম্যাচ জিতেছিল, যার মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম লেগও রয়েছে। মায়োর্কার বিপক্ষে ম্যাচে এমবাপ্পে ছয়টি শট নিয়ে তিনটি লক্ষ্য রাখলেও গোলকিপারকে ফাঁকি দিতে পারেননি। তাঁর জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু দ্রুত গোলের ধারায় ফিরতে হবে। কারণ, এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস একসঙ্গে খেললে রক্ষণে ঘাটতি তৈরি হয়, যা পুষিয়ে দিতে গোল অপরিহার্য।
২. ঘুরে দাঁড়ানোর অক্ষমতা: ঐতিহ্য হারানো
রিয়াল মাদ্রিদ একসময় ম্যাচ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে গোল করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এখন সেই সামর্থ্য তারা হারিয়ে ফেলেছে। মায়োর্কার কাছে হারের পর কোচ আরবেলোয়া বলেছেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমরা অনেক ভালো খেলতে পারিনি, এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।’ আরবেলোয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর সাতবার পিছিয়ে পড়ে মাত্র দুবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে দলটি। সামনের ম্যাচগুলোয় এই অভ্যাস ফেরাতে না পারলে বিপদ আরও বাড়বে।
৩. ফিটনেস সমস্যা ও চোটের দীর্ঘ তালিকা
এই মৌসুমে রিয়ালের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার একটি বড় কারণ ফিটনেস সমস্যা। মৌসুমের মাঝপথে বরখাস্ত হওয়া কোচ জাবি আলোনসো ও সাবেক ফিটনেস কোচ ইসমায়েল কামেনফোর্তের দিকে আঙুল তুলছেন অনেকে। পরে আন্তোনিও পিন্টুসকে ফিটনেস কোচের দায়িত্ব দেওয়া হলেও স্বল্প সময়ে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব হয়নি। এমবাপ্পে ও জুড বেলিংহাম চোট কাটিয়ে ফিরলেও রদ্রিগোর মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। থিবো কোর্তোয়া, ফেরলাঁ মেন্দি ও দানি সেবায়েস চোট নিয়ে দলের বাইরে রয়েছেন। মৌসুমের শেষ ভাগে নতুন চোট এড়াতে সতর্কতা জরুরি।
৪. নতুনদের ব্যর্থতা: বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
গত গ্রীষ্মে রিয়াল প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে ডিন হুইসেন, ক্যারেরাস, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়েনা ও ট্রেন্ট আলেক্সান্দার আরনল্ডকে দলে ভিড়িয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে হতাশ করেছেন। হুইসেন এখন ভালো ছন্দে আছেন, তবে মায়োর্কা ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখার পর তুলে নেওয়া হয়েছেন। আরনল্ড হুটহাট ভালো খেললেও ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট। ক্যারেরাস আক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। সবচেয়ে হতাশ করেছেন মাস্তানতুয়োনো, যিনি একাদশ থেকেই জায়গা হারিয়েছেন এবং মায়োর্কার বিপক্ষে নিষ্প্রভ ছিলেন। নতুনরা ভূমিকা না রাখলে আরেকটি হতাশার মৌসুম দেখতে হতে পারে রিয়ালকে।
৫. পরিকল্পনাহীনতা: ‘প্ল্যান বি’-এর অভাব
২০২৩-২৪ মৌসুমে রিয়ালের সফল অভিযানে হোসেলু, আন্দ্রেই লুনিন, নাচো ফার্নান্দেজ ও লুকা মদরিচের মতো বদলি খেলোয়াড়রা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন। কিন্তু এবার দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়েরা প্রায় কোনো ছাপই রাখতে পারছেন না। মায়োর্কা ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ও মাস্তাতুয়োনো বদলি নেমে কৌশলে চমক দেখাতে পারেননি। বোঝাই যাচ্ছে, বিপদের সময় দলকে টেনে তোলার কোনো ‘প্ল্যান বি’ আরবেলোয়ার ঝুলিতে নেই। দ্রুত বিকল্প পরিকল্পনা হাজির না করলে রিয়ালকে আরও বেশি ভূগতে হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রিয়াল মাদ্রিদকে শিরোপা জয়ের জন্য এই ৫টি সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে হবে। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগে টিকে থাকতে হলে দলটিকে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে খেলতে হবে, নতুবা মৌসুমটি হতাশায় শেষ হতে পারে।



