যুবরাজ সামরার সেঞ্চুরি: নামের মিল নয়, প্রতিভার ঝলকেই বিশ্বকাপে ইতিহাস
সেঞ্চুরির পর যুবরাজের নামের মহিমা কি শুধু শেক্সপিয়রের ‘গোলাপ’ তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ? নাকি নামের গুণে ভাগ্যও বদলে যায়! উত্তর খুঁজতে আজ চেন্নাইয়ের এমএ চিদম্বরম স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ডের দিকে তাকান। সেখানে যুবরাজ সিং নামে একজনকে দেখবেন। প্রথমে খটকা লাগলেও, তিনি ভারতের সেই কিংবদন্তি নন, বরং কানাডার ১৯ বছর বয়সী বাঁহাতি ওপেনার যুবরাজ সিং সামরা।
ব্যাটের দাপটে কিংবদন্তির প্রতিচ্ছবি
শুধু নামের মিল নয়, ব্যাটের ধারেও তিনি ২০১১ বিশ্বকাপজয়ী যুবরাজ সিংয়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর ব্যাটিং স্টাইল মনে করিয়ে দিচ্ছিল ২০০৭-এর ডারবান বা ২০১১-এর মোহালির সেই ঐতিহাসিক ইনিংসগুলো। বাবা বলজিৎ কামরা ভারতের সেই অলরাউন্ডারের ভক্ত ছিলেন বলেই ছেলের নাম রেখেছিলেন যুবরাজ, এমনকি ছোটবেলায় তাঁকে ডানহাতি থেকে বাঁহাতি বানিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে যে একদিন বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়বেন, তা বাবা কল্পনাও করেননি।
রেকর্ড ভাঙার মহাযজ্ঞ
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ‘ডি’ গ্রুপের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে যুবরাজ সামরা যা করলেন, সেটা স্রেফ ব্যাটিং নয়, এক ১৯ বছরের তরুণের স্পর্ধিত ঘোষণা। ম্যাট হেনরি থেকে জিমি নিশাম—কাউকেই ছাড়েননি। তাঁর ৬৫ বলে ১১০ রানের ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৬টি ছক্কা। এই এক ইনিংসেই তিনি গড়েছেন একগাদা রেকর্ড।
যুবরাজ সামরা এখন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সহযোগী কোনো দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। এছাড়া, আহমেদ শেহজাদের রেকর্ড ভেঙে তিনি এই টুর্নামেন্টের কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ানও। ওয়ানডে বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান আয়ারল্যান্ডের পল স্টার্লিংকেও পেছনে ফেলে, ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি এখন কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ান।
উদ্বোধনী জুটিতে ইতিহাস
নিউজিল্যান্ডের একাদশে লকি ফার্গুসন বা মিচেল স্যান্টনার না থাকলেও ম্যাট হেনরি, জিমি নিশামরা ছিলেন। হেনরিকে টানা দুই চারে শুরু, নিশামের পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে ১৮ রান, এবং মাত্র ৩৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে যুবরাজ শুরু থেকেই উজ্জ্বল ছিলেন। অধিনায়ক দিলপ্রীত বাজওয়ার সঙ্গে তাঁর উদ্বোধনী জুটিতে ১১৬ রান যোগ করে ইতিহাস গড়েছেন। সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে কোনো পূর্ণ সদস্য দেশের বিপক্ষে এটিই এখন সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি।
ব্র্যাম্পটন থেকে বিশ্বমঞ্চে
কানাডার ব্র্যাম্পটনে জন্ম নেওয়া এই পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত তরুণের ক্রিকেটে হাতেখড়ি টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট লিগে। গত বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকেই প্রতিভার ঝলক দেখাচ্ছিলেন। বাহামার বিপক্ষে ১৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে জানান দিয়েছিলেন, তিনি ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের জন্যই জন্মেছেন। তবে চেন্নাইয়ের মন্থর উইকেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই সেঞ্চুরিটি তাঁকে নিয়ে গেল অন্য উচ্চতায়।
হারেও জয়ের গল্প
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা কানাডা জিততে পারেনি। আগে ব্যাট করে তাদের ৪ উইকেটে ১৭৩ রান নিউজিল্যান্ড তাড়া করে ফেলেছে হেসেখেলেই। তৃতীয় উইকেটে গ্লেন ফিলিপস ও রাচিন রবীন্দ্রর ৭৩ বলে অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১৪৬ রান তুলে কিউইরা জিতেছে ৮ উইকেট আর ২৯ বল হাতে রেখে, সুপার এইটে চলে গেছে। তবে দিন শেষে স্কোরবোর্ডে কানাডার হারের খতিয়ান যাই হোক, চেন্নাইয়ের দর্শক মনে রাখবেন এক নতুন ‘যুবরাজ’কে। যার প্রতিটি শট যেন চিৎকার করে বলছিল—শুধু নামের মিল দিয়ে নয়, প্রতিভা দিয়েই তিনি পরিচিত হতে চান।
