আন্দিজ পর্বতের কাঁপতে থাকা বুক, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আর এক বিধ্বস্ত দেশের চোখের জলের ভিতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন বিশ্বকাপ। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ ছিল পুনর্জন্মের কাহিনি। ধ্বংসের ভেতর থেকেও দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঘোষণা। আর সেই ঘোষণার মাঝখানে সাম্বার ছন্দে বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল ব্রাজিল।
গ্যারিঞ্চার বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপকে নাম দেওয়া হয়েছিল 'গ্যারিঞ্চার বিশ্বকাপ'। সবাই ভেবেছিল পেলের জাদুতেই ব্রাজিল বেঁচে থাকবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম আঘাতে যখন পেলে ছিটকে গেলেন, তখন পৃথিবী দেখল আরেক বিস্ময়মানবকে। যেন ফুটবল ঈশ্বর বললেন, একটি নক্ষত্র হারালেও আকাশ কখনও অন্ধকার থাকে না।
১৯৬২ বিশ্বকাপকে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে ৪–৩–৩ পদ্ধতির আধুনিক রূপ। সেই সময় ফুটবল কৌশলের বিবর্তনে এই টুর্নামেন্ট ছিল এক নতুন যুগের সূচনা।
চিলির পুনর্জন্ম
চিলি তখন দরিদ্র, ক্ষতবিক্ষত, ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, এই দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের সভায় যখন আয়োজক নির্ধারণ হচ্ছিল, তখন চিলি কার্যত নিঃস্ব। কিন্তু চিলি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কার্লোস ডিটবর্ন আবেগে, যুক্তিতে, আত্মবিশ্বাসে সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার কণ্ঠে তখন এক বিধ্বস্ত জাতির আর্তি।
তিনি বলেছিলেন, 'আমাদের দেশকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দিতেই হবে। কারণ এই মুহূর্তে ফুটবল ছাড়া আমাদের আর কোনো অবলম্বন নেই।' ফিফা সেই আবেদন ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
তারপর শুরু হয় এক অসম্ভব যুদ্ধ। বরফঢাকা পাহাড়ঘেরা সান্তিয়াগোতে গড়ে ওঠে বিশাল স্টেডিয়াম। ভিনা দেল মারের সমুদ্রতীরে তৈরি হয় আধুনিক ফুটবলমঞ্চ। সমুদ্রের ঢেউ, লবণাক্ত হাওয়া, পাথরের উপর বসে থাকা পেলিক্যান, আর দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের গর্জন যেন বিশ্বকাপকে এক রহস্যময় আবহ দিচ্ছিল।
রানকাগুয়ার ব্রাডেন কপার কোম্পানি স্টেডিয়াম প্রস্তুত হল তৃতীয় গ্রুপের জন্য। আর কয়েক হাজার মাইল উত্তরে পেরুর সীমান্তঘেঁষা আরিকা শহরে বসানো হল চতুর্থ গ্রুপের খেলা।
চিলি শুধু অবকাঠামোই গড়েনি, নিজেদের দলকেও গড়ে তুলেছিল নতুন স্বপ্নে। তাদের ধারাবাহিক সাফল্যে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল উন্মাদনা। রাজধানীর রাস্তায় সারারাত মানুষ গান গেয়েছে। মোটরগাড়ির হর্নে কেঁপে উঠেছে শহর। চারদিকে একটাই ধ্বনি, 'ভিভা চিলি।'
তবুও সমালোচনা থামেনি। টিকিট কেলেঙ্কারি, বিশৃঙ্খলা, দুর্বল আয়োজন নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল। ইতালীয় কিছু সাংবাদিক বলেছিল, এটি পশ্চাৎপদ, বিশৃঙ্খল, অনুন্নত এক দেশ। কিন্তু মাঠের ফুটবল সব বিদ্রূপের জবাব দিয়ে দিল।
সান্তিয়াগোর আকাশে তখন শীতের ধোঁয়াটে বিষণ্নতা। বাতাসে ছিল এক ধরনের বিষাদ। অথচ সেই অন্ধকারের মাঝেও বিশ্বকাপের আলো নিভে যায়নি। বরং বিদেশি দল আর দর্শকরা চিলি ছেড়ে ফিরেছিল মুগ্ধ স্মৃতি নিয়ে।
ব্রাজিলের প্রস্তুতি ও দল
দক্ষিণ আমেরিকার আবহাওয়ায় ব্রাজিল ছিল স্বাভাবিকভাবেই ফেবারিট। অসুস্থতার কারণে ভিসেন্তে ফিওলাকে সরে দাঁড়াতে হয়। দায়িত্ব নেন আইমোরে মোরেইরা। শান্ত, ধৈর্যশীল, সাদা চুলের এই মানুষটির সঙ্গে ছিলেন হিলটন গসলিং। তাদের নেতৃত্বেই ব্রাজিল হয়ে উঠেছিল আরও পরিণত, আরও ভয়ংকর। ভিনা দেল মার গ্রুপে ব্রাজিলের সঙ্গে ছিল চেকোশ্লোভাকিয়া, স্পেন ও মেক্সিকো।
১৯৫৮ সালে যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে ব্রাজিল বিশ্বজয় করেছিল, মাঝে তা ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে আবার সবাই এক হয়ে গেল। ভাভা ফিরে এলেন। ডিডি ফিরে এলেন। রিয়াল মাদ্রিদে যথেষ্ট গুরুত্ব না পেয়ে ডিডি দেশে ফিরে নিজের জায়গা পুনরুদ্ধার করেন। ভাভা আবার কেন্দ্র আক্রমণের দায়িত্ব নিলেন।
পেলের জায়গা ছিল অনড়। তার শরীরী ভারসাম্য, বিস্ফোরক গতি, অকল্পনীয় ড্রিবলিং পৃথিবীকে অভিভূত করেছিল। তখনকার অনেক বিশেষজ্ঞ বলতেন, ডি স্টেফানো কিংবা পুসকাসও পেলের দীপ্তির সামনে ম্লান।
গ্যারিঞ্চা ছিলেন অন্য এক বিস্ময়। বেঁকে যাওয়া পা, অদ্ভুত হাঁটা, কিন্তু বল পায়ে নিলেই তিনি যেন প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে ফেলতেন। আট সন্তানের বাবা এই মানুষটির ব্যক্তিজীবনও ছিল আলোচিত। সেই সময় বিখ্যাত গায়িকা এলজা সোয়ারেসের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে পুরো ব্রাজিল সরব ছিল।
ব্রাজিল দলে নিলটন সান্তোস, জিলমার, মাউরো, জোজিমো, জিতো, জাগালো সবাই নিজেদের সেরা ছন্দে ছিলেন। জাগালো বিশেষভাবে হয়ে উঠেছিলেন দলের ভারসাম্যের কেন্দ্র। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই লেফট উইঙ্গার নিজের স্ট্যামিনা, ত্যাগ আর কৌশলগত বুদ্ধিমত্তায় ব্রাজিলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
ফরাসি সাংবাদিক জ্যাঁ ফিলিপ রেথাকার লিখেছিলেন, '১৯৬২ বিশ্বকাপ যতটা গ্যারিঞ্চার, ঠিক ততটাই জাগালোর।' জাগালো ছিলেন আত্মত্যাগী শিল্পী। মাঝমাঠ থেকে দৌড়ে রক্ষণে নামতেন, আবার আক্রমণে উঠে গিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করতেন। তার ফুসফুস যেন অফুরন্ত শক্তির আধার।
প্রতিপক্ষের শক্তি
চেকোশ্লোভাকিয়া ছিল নীরব কিন্তু ভয়ংকর এক দল। তাদের খেলা ধীর, হিসেবি, কিন্তু মারাত্মক কার্যকর। জোসেফ মাসোপুস্ট ছিলেন দলের প্রাণ। ঠাণ্ডা মাথার এই মিডফিল্ডার প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। গোলরক্ষক ভিলিয়াম শ্রইফ তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে বিবেচিত।
স্পেন এসেছিল হেলেনিও হেরেরার অধীনে। কিন্তু ডি স্টেফানোর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব পুরো দলকে অস্থির করে তুলেছিল। লুইস সুয়ারেজ, পুসকাস, মার্টিনেজদের নিয়ে দল শক্তিশালী হলেও ভেতরে ভেতরে ভাঙন ছিল।
রানকাগুয়ার গ্রুপে ইংল্যান্ডও এসেছিল বড় আশা নিয়ে। জনি হেইন্স, ববি চার্লটন, জিমি গ্রিভস, ববি মুর, জিম আর্মফিল্ডদের নিয়ে দলটি প্রতিভায় ভরপুর ছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল ঐক্যে। পুরো আক্রমণ নির্ভর করছিল হেইন্সের উপর। ব্রাজিল কোচ মজা করে বলেছিলেন, 'ইংল্যান্ডে কি দশ নম্বর ছাড়া আর কেউ নেই?' হাঙ্গেরি সেই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিল। ফ্লোরিয়ান আলবার্টের অসাধারণ নৈপুণ্য সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।
সান্তিয়াগো গ্রুপে ছিল ইতালি, চিলি, পশ্চিম জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড। ইতালীয় সাংবাদিকদের অপপ্রচারে চিলির জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারা চিলিকে অশিক্ষিত, বিশৃঙ্খল, অনুন্নত দেশ বলে কটাক্ষ করেছিল। ফলে ইতালি বনাম চিলি ম্যাচে আবেগ বিস্ফোরিত হয়েছিল ভয়ংকরভাবে।
গ্রুপ পর্বের নাটকীয়তা
উদ্বোধনী ম্যাচে চিলি ৩–১ গোলে হারায় সুইজারল্যান্ডকে। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও লিওনেল সানচেজের দুর্দান্ত ফুটবলে তারা ঘুরে দাঁড়ায়। পুরো স্টেডিয়াম তখন আগ্নেয়গিরির মতো গর্জে উঠছিল।
ইংল্যান্ড হাঙ্গেরির কাছে ২–১ গোলে হেরে হতাশ হয়ে পড়ে। জনি হেইন্সকে ঘিরে অতিরিক্ত নির্ভরতা দলকে ডুবিয়ে দেয়। অন্যদিকে ববি চার্লটন তখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিলেন ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ।
ভিনা দেল মারের সমুদ্রতীরের স্টেডিয়ামে ব্রাজিল মুখোমুখি হয় মেক্সিকোর। মেক্সিকানরা অবাক করা সাহস দেখিয়েছিল। তারা একাধিকবার ব্রাজিলকে চাপে ফেলে। কিন্তু পেলে ও জাগালোর অসাধারণ বোঝাপড়ায় ব্রাজিল ম্যাচ জিতে নেয়। পেলের দ্বিতীয় গোলটি ছিল শিল্পকর্ম। চারজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তিনি যেন বাতাস চিরে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই ঘটে বিপর্যয়। পেলে আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন। পুরো ব্রাজিল স্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয়েছিল বিশ্বকাপ বুঝি শেষ। সেই শূন্যতার ভিতর থেকেই জন্ম নিল গ্যারিঞ্চার কিংবদন্তি।
নকআউট পর্ব ও ফাইনাল
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গ্যারিঞ্চা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তিনি গোল করলেন, গোল বানালেন, পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করলেন। তার এক হেড দেখে মনে হয়েছিল মানুষ মাধ্যাকর্ষণকে হারিয়ে দিয়েছে। চার্লটন, গ্রিভস, হেইন্সরা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্রাজিল ছিল অনেক বেশি জীবন্ত, অনেক বেশি সৃজনশীল।
চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে পুরো স্টেডিয়াম ছিল আগুনের মতো। গ্যালারির প্রতিটি চিৎকারে কেঁপে উঠছিল মাঠ। গ্যারিঞ্চা তখন একাই যেন ঝড় তুলছিলেন। তিনি ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সহজতায়, যেন তারা বাস্তব মানুষ নয়। চিলি শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে প্রাণপণে। কিন্তু ব্রাজিলকে থামানো যায়নি।
অন্য সেমিফাইনালে চেকোশ্লোভাকিয়া হারায় যুগোশ্লাভিয়াকে। মাসোপুস্টের নেতৃত্বে তারা ছিল নিখুঁত যন্ত্রের মতো। ফাইনালে প্রথম গোল করে চেকোশ্লোভাকিয়া। মুহূর্তেই স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। মনে হচ্ছিল ইতিহাস বদলে যাচ্ছে। কিন্তু ব্রাজিল হার মানেনি।
আমারিল্ডো আলো জ্বালালেন। ভাভা গোল করলেন। জিতো হেডে আঘাত হানলেন। আর গ্যারিঞ্চা পুরো ম্যাচের আত্মা হয়ে উঠলেন। শেষ বাঁশি বাজতেই ব্রাজিল দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
ব্রাজিল কেবল একজন পেলের দল নয়। এটি ছিল এক পুরো দলের জাদু। গ্যারিঞ্চার উত্থান, জাগালোর আত্মত্যাগ, ডিডির প্রজ্ঞা, জিলমারের নীরব সাহস, আর সাম্বার অমর আত্মার জয়।
চেকোশ্লোভাকিয়ার ১–০ ব্যবধানে স্পেনকে হারানোর সেই মুহূর্তটি যেন শেষ বাঁশির আগে হঠাৎ জ্বলে ওঠা এক বজ্ররেখা। রাইট উইঙ্গার স্টিরানির নিখুঁত ফিনিশিং স্পেনের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। স্পেনের সুযোগ ছিল, কিন্তু আঘাতে বিধ্বস্ত রেজিয়া কিংবা স্যান্টামারিয়ার শেষ প্রতিরোধে ভাগ্যের কাছে হার মানে। ধীরে ধীরে ম্যাচের দখল চলে যায় চেকদের হাতে।
চেকোশ্লোভাকিয়ার রক্ষণভাগ, বিশেষ করে গোলরক্ষক সইফ, যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর। প্রতিটি আক্রমণ ফিরে আসে ঢেউয়ের মতো ভেঙে। স্পেনের প্রতিটি চেষ্টা সেখানে এসে থেমে যায়। আর শেষ দিকে, হতাশার এক অন্ধকারে ডুবে মার্টিনেজের অনুচিত আঘাত ম্যাচের আবহাওয়াকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। কিন্তু চেকরা নড়ে না তারা অপেক্ষা করে, ঠিক যেমন পাহাড় অপেক্ষা করে ঝড়ের পর নীরবতার।
অবশেষে আসে সেই আঘাত। স্টিরানির গোল। মাঝমাঠে কাসানিয়াকের শিল্পময় নিয়ন্ত্রণ পুরো খেলাকে এক নতুন ছন্দে বেঁধে দেয়। চেকোশ্লোভাকিয়া জয় নিশ্চিত করে এগিয়ে যায় দৃঢ় পদক্ষেপে।
অন্য প্রান্তে, কলম্বিয়ার ছোট্ট বিপ্লব। পেনাল্টি থেকে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত উরুগুয়ের গতি ও কুবিল্লার আক্রমণ তাদের ভেঙে দেয় ২–১ ব্যবধানে। দক্ষিণ আমেরিকার মাঠে যেন প্রতিটি মিনিটই নাটকের নতুন দৃশ্য লিখছিল।
পরদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ২–০ গোলে হারায় চেকোশ্লোভাকিয়াকে। তবে স্কোরলাইন যতটা পরিষ্কার, খেলা ততটা ছিল না। নামী তারকাদের উপস্থিতিতেও ম্যাচে প্রাণের ঘাটতি ছিল। তবু লেভ ইয়াচিন আবারও প্রমাণ করেন, বয়স তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দুর্দান্ত নৈপুণ্যে তিনি একের পর এক শট ফিরিয়ে দেন।
পোনেদেলনিকের শক্তিশালী শট, ইভানভের ফিনিশিংয়ে সোভিয়েত আক্রমণ ছিল ধারালো, কিন্তু মানবিক ক্লান্তির ছায়াও স্পষ্ট। মাঠের বাইরে নীরবতা, লড়াইয়ের এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীন দৃশ্য।
ইউরোপে আবার পশ্চিম জার্মানি ২–১ ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডকে হারালেও ম্যাচের সৌন্দর্য ঢেকে যায় এক ভয়াবহ ট্যাকলের আঘাতে। দর্শকের গ্যালারি মুহূর্তে স্তব্ধ। ফুটবলের উজ্জ্বল আলো যেন হঠাৎ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
আর চিলি–ইতালি ম্যাচে ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে জন্ম নেয় উত্তেজনার বিস্ফোরণ। বিতর্ক, অভিযোগ, সহিংসতায় সব ম্যাচটি রূপ নেয় এক অস্থির যুদ্ধক্ষেত্রে। রেফারির সিদ্ধান্ত, সাংবাদিকদের তর্ক, খেলোয়াড়দের ক্ষোভে ফুটবল হারিয়ে ফেলে তার কোমল মুখ।
ইতিহাসের এই অধ্যায়ে উঠে আসে আরেক নাম। লেভ ইয়াচিন। যদিও একটি ম্যাচ তাকে আঘাত করে, তবুও তার দক্ষতা, প্রতিক্রিয়া ও ঠাণ্ডা মাথার নিয়ন্ত্রণ তাকে আলাদা করে রাখে সর্বকালের সেরাদের কাতারে।
হাঙ্গেরির বিস্ফোরণ ছিল আরও নির্মম। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ৬–১ গোলের ঝড়। অ্যালবার্ট, গেরোকস, সলিমসির নামগুলো গোলের সাথে জড়িয়ে থাকা একেকটি আগুনের রেখা। এরপর আর্জেন্টিনার সাথে কৌশলগত ড্র, যেখানে হাঙ্গেরি হিসেব করে এগোয়।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড বদলে দেয় কৌশল, চার্লটন ও ফ্লাওয়ার্সের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনাকে ৩–১ গোলে হারিয়ে দেয় তারা। পিককের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি, পেনাল্টির নিখুঁত ব্যবহারে সব ইংল্যান্ডের উত্থান স্পষ্ট।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ব্রাজিল শিবিরে। পেলের বিদায়। চেকোশ্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তার চোট বিশ্বকাপের ভারসাম্য নাড়িয়ে দেয়। গ্যারিঞ্চার কাঁধে তখন পুরো ব্রাজিলের স্বপ্ন।
কিন্তু গ্যারিঞ্চা ছিলেন ঝড়ের মতোই অপ্রতিরোধ্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার আকাশছোঁয়া হেড, দূরপাল্লার শট ব্রাজিলকে জয় এনে দেয় ৩–১ ব্যবধানে। ফ্লাওয়ার্সের ভুল, ইংল্যান্ডের অনিশ্চয়তায় ম্যাচটি ব্রাজিলের নামে লেখা হয়।
সেমিফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে ব্রাজিল আরও উজ্জ্বল। গ্যারিঞ্চা যেন একাই ম্যাচের রং বদলে দেন। দ্রুত আক্রমণ, নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্রাজিল জেতে ৪–২ গোলে।
ফাইনালে চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বপ্ন ছিল সাহসী, কিন্তু বাস্তব ছিল নির্মম। শুরুতেই তারা এগিয়ে যায়, সইফের দৃঢ়তা কিছুক্ষণ দেয় প্রতিরোধ। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্রাজিল ফিরে আসে। আমারিল্ডো, জিটো, জাগালো একেকটি নাম যেন আঘাতের ঢেউ। শেষ পর্যন্ত ৩–১ গোলে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে। পেলেকে ছাড়া এই জয় ছিল নতুন জন্মের মতো।
এক দল থেকে আরেক দলের রূপান্তর, এক কিংবদন্তি থেকে আরেক কিংবদন্তির উত্থান। আর এভাবেই ১৯৬২ বিশ্বকাপ শেষ হয়। রক্ত, বিতর্ক, প্রতিভা আর আবেগে লেখা এক বিশাল মহাকাব্য, যেখানে ফুটবল শুধু খেলা নয়, হয়ে ওঠে মানবিক নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল মঞ্চ।



