নওগাঁর বরেন্দ্রে পানির স্তর উদ্বেগজনক হারে নিচে, সংকটে জনজীবন
নওগাঁয় পানির স্তর নিচে, সংকটে জনজীবন

নওগাঁর বরেন্দ্রে পানির স্তর উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের গণপুর গ্রামে একটি মেঠো রাস্তার পাশে সাবমার্সিবল পাম্পের সাহায্যে তোলা পানি ট্যাংকে সংরক্ষণ করা আছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুমিতা রানী সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রায় ২০০ মিটার দূরের নিজ গ্রাম দক্ষিণ লক্ষ্মীপুরে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, 'হামাগের পাড়াত খাবার পানি পাওয়া যায় না। প্রতিদিন তিন-চার বালতি পানি লিয়ে যাওয়া লাগে। এত দূর থ্যাকে পানি লিয়ে য্যাতে কষ্ট হয়।'

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সেচের জন্য গভীর নলকূপের ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলাধার ও খালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এক-দেড় দশক আগেও অল্প গভীরতাতেই পানির স্তর পাওয়া যেত, কিন্তু এখন অনেক গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না।

পানির সংকটের ব্যাপকতা

এ অবস্থা শুধু নওগাঁরই নয়, উত্তরের জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জেরও অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৩ হাজার ৫৯৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ, উচ্চ এবং মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার চারটি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নকে অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র

'সাসটেইনিং গ্রাউন্ড ওয়াটার ইরিগেশন ফর ফুড সিকিউরিটি ইন দ্য নর্থইস্ট রিজিয়ন অব বাংলাদেশ' শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলার পানির স্তর নামছেই। বর্ষা মৌসুমেও এ স্তর স্বাভাবিক অবস্থায় আসছে না রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গবেষণায়ও দেখা যায়, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নামছে ঢাকা নগর, গাজীপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চলে।

সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রভাব

বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩–এর আলোকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে আদেশ জারি হয়েছে। এসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ থাকবে। এখন যেসব নলকূপ আছে সেগুলোর মাধ্যমে খাওয়ার পানি সরবরাহ অব্যাহত রেখে সেচকাজের ফসল বৈচিত্র্যকরণ করে পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্থানীয়দের দুর্ভোগ

পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, শীতলডাঙ্গা ও হাড়ভাংগা গ্রামে ছয়-সাত বছর ধরে হাতে চাপা নলকূপে কোনো পানি ওঠে না। গভীর নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয় গ্রামের বাসিন্দাদের। কোথাও কোথাও ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে গভীর নলকূপে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। হাড়ভাংগা গ্রামের স্কুলশিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, 'চৈত্র-বৈশাখ মাসে গভীর নলকূপ ও সাবমার্সিবল পাম্প থেকেও পানি ওঠে না। তখন গ্রামের এক পাড়ার লোক আরেক পাড়ায় গিয়ে পানি সংগ্রহ করে আনে।'

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতা

সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করেন বিশেষজ্ঞরা, তবে তাঁরা মনে করেন ঘোষণা দেওয়া এবং সেইমতো কাজ পরিচালনার মধ্যে ফারাক আছে। ইতিমধ্যে গরম পড়েছে এবং শুকনা মৌসুম এসে গেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সরকারের এসব নির্দেশনা ও করণীয় সম্পর্কে কোনো বার্তা যায়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক আহমেদ বলেন, 'সংকটাপন্ন এলাকার কথা জেনেছি। তবে সরকারের কোনো নির্দেশনা আছে কি না, তা খোঁজ করে জানতে হবে। সম্ভবত আসেনি।'

পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, 'আমরা এসব বিষয় নিয়ে ঈদের পর বসব। সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে আরও বিস্তারিত কাজ করা যায় কি না, তা–ও বিবেচনা করা হবে।' এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।