জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের সিদ্ধান্ত: পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক সভায় কয়েকটি জেলাকে অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিডি গেজেটের সাথে কথা বলেছেন পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসিন জাহান। তিনি এই ঘোষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পানিসংকটের জটিলতা ও সমাধানের পথ
হাসিন জাহান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে পানিসংকট নিয়ে আলোচনা হলেও এর প্রকৃত জটিলতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। তিনি বলেন, "শুধু সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেই হবে না, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে কীভাবে এসব এলাকায় সামগ্রিকভাবে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা করে পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।" তিনি কৃষি, শিল্প ও খাওয়ার পানির ব্যবহার নিয়ে সম্মিলিত পরিকল্পনা ও গবেষণাভিত্তিক উপাত্তনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাসের কারণ
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে হাসিন জাহান কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়, যা পানির স্তর হ্রাসের একটি বড় কারণ। এছাড়া মাটির গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খরা ও জলাধার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সংকটকে তীব্র করেছে।
সারা দেশের ভূগর্ভস্থ পানির ম্যাপিং ও তথ্য বিশ্লেষণ
হাসিন জাহান সরকারের উচিত সারা দেশের ভূগর্ভস্থ পানির ম্যাপিং করা এবং পানির বর্তমান উৎসগুলো চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রচুর তথ্য রয়েছে। এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে এনে বিশ্লেষণ করলে বড় খরচ ছাড়াই পানির সঠিক ব্যবহারের জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব।"
কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক নির্ভরতা কমানোর উপায়
বাংলাদেশে কৃষি, বিশেষ করে বোরো ধান চাষে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য হাসিন জাহান তিনটি প্রধান উপায় তুলে ধরেন। প্রথমত, কম পানি লাগে এমন ফসল চাষে প্রণোদনা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সাশ্রয়ী সেচপদ্ধতি যেমন AWD প্রযুক্তি ব্যবহার করা। তৃতীয়ত, কৃষি ও শিল্প খাতে পানির ব্যবহারকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলের পানিসংকটের ভিন্নতা
চট্টগ্রামের পটিয়ার মতো উপকূলীয় এলাকা ও বান্দরবান, রাঙামাটির মতো পাহাড়ি অঞ্চলে পানিসংকটের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সংকট তীব্র হচ্ছে। হাসিন জাহান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা প্রধান সমস্যা, যেখানে পাহাড়ি অঞ্চলে নির্বিচার বন উজাড় ঝরনার উৎস ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি এই দুই অঞ্চলের জন্য ভিন্নধর্মী কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
নীতিমালা বাস্তবায়নে জবাবদিহির ঘাটতি
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩–২০৫০) সহ বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও হাসিন জাহান বাস্তবায়নের জায়গায় দুর্বলতা লক্ষ্য করেন। তিনি বলেন, "কাগজে-কলমে শক্তিশালী নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত থেকে যায়। বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই ব্যবধান দূর করা সম্ভব নয়।"
এনজিওগুলোর ভূমিকা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা
ঘোষিত পানিসংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে এনজিওগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে হাসিন জাহান বলেন, "একটি সমন্বিত ব্যবস্থার প্রয়োজন যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার, গবেষণা সংস্থা, এনজিও ও সাধারণ জনগণ একসঙ্গে কাজ করবে।" তিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সামান্য সচেতনতাও জাতীয় পানিনিরাপত্তায় বিশাল অবদান রাখতে পারে।



