চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাবসহ একগুচ্ছ সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন উপলক্ষে আয়োজিত এই সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতারা অংশগ্রহণ করেন।
এনবিআর চেয়ারম্যানের প্রতিশ্রুতি
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ অত্যাবশ্যক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবাইকে চাপে ফেলে রাজস্ব সংগ্রহ না করে বরং করহার যৌক্তিক করা হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের লক্ষ্য অর্জনেও এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভ্যাট ও ট্যাক্স নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত করদাতাদের উৎসাহিত করতে সিস্টেম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। অগ্রিম কর বা অতিরিক্ত ভ্যাট প্রদানকারীদের দ্রুত রিফান্ডের জন্য সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করা হবে। এছাড়াও, সরকার ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও পেপারলেস করার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং নিয়মগুলোকে ডিরেগুলেট করার উদ্যোগ নিয়েছে।
চেম্বারের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা
চেম্বার প্রশাসক মো. মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়।
- বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব।
- আমদানি পর্যায়ে করহার পুনর্বিন্যাস ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য নানাবিধ প্রণোদনার বিকল্প উপায় অনুসন্ধান।
- কর পদ্ধতির সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করা।
- বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক্যাল ভেহিক্যাল আমদানিতে শুল্ক সাশ্রয় এবং নতুন রিফাইনারি স্থাপন।
সভায় চেম্বারের পক্ষ থেকে মোট ১৩৬টি প্রস্তাবনা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আয়কর বিষয়ক ৩৩টি, ভ্যাট বিষয়ক ৩৬টি এবং শুল্ক বিষয়ক ৬৭টি সুপারিশ।
ব্যবসায়ী নেতাদের অন্যান্য প্রস্তাব
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সভায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
- চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
- ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রামের সকল সংস্থার ল্যাব আধুনিকায়ন।
- গার্মেন্টস শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সোলার প্যানেল ও সোলার লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানিতে শুল্ক কমানো।
- সর্বোচ্চ ভ্যাট হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসা।
- দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পকে সুরক্ষা ও প্রণোদনা প্রদান।
- চট্টগ্রাম কাস্টমসের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট সংস্কার ও যৌক্তিককরণ।
উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
সভায় চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদ আহমেদ চৌধুরী, উইমেন চেম্বারের সভাপতি আবিদা মোস্তফা, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মো. আমিরুল হক, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, সাবেক পরিচালক ড. মঈনুল ইসলাম মাহমুদ, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এক্সেসরিজ গ্রুপের সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরীসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর, মো. আজিজুর রহমান, পান রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. একরামুল করিম চৌধুরী, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম, কনফিডেন্স সিমেন্টের পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ, পিএইচপি গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ আলী হোসেন চৌধুরী (সোহাগ), লুব-রেফরের এমডি মোহাম্মদ ইউসুফ, চিটাগাং ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল কালাম এবং চট্টগ্রাম কাগজ ও সেলোফেন ব্যবসায়ী গ্রুপের পরিচালক ইউসুফ চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিত্বও এই মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন।
এই প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় উপস্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ব্যবসায়ী মহলের আশাবাদ।



