মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা: রিজার্ভ সংরক্ষণ ও সুদহার স্থিতিশীল রাখার আহ্বান
দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, নীতি সুদহার এখনই না কমানো এবং ডলার বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ বৈঠকে তারা এসব সুপারিশ উপস্থাপন করেন।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়সমূহ
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, প্রবাসী আয় এবং ডলার বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে আগাম সতর্ক অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে তারা মত প্রকাশ করেন।
তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যবহার না করে সংরক্ষণে জোর দেওয়া উচিত। বিশেষ করে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে আমদানি অর্থায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তারা। জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস দেখার কথাও হয় বৈঠকে। ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেন অর্থনীতিবিদরা।
মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ে সতর্কতা
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা এখনই সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে সমন্বয় না করার পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে থাকায় নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তও এখনই না নেওয়ার সুপারিশ করেন তারা।
তাদের মতামত হলো, বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হলে তখন সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিশ্রুত ঋণ দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাব্য ঝুঁকি
বৈঠকে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে আসে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি খারাপ হলে শ্রমিকদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহে। তাই প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার ওপর জোর দেওয়া উচিত।
সভায় উপস্থিত এক অর্থনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গভর্নরকে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—রিজার্ভ ক্ষয় না করা, নীতি সুদহার আপাতত না কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের অস্বাভাবিক উত্থান ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
গভর্নরের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব
বৈঠকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, তিনি সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তাদের মতে, এ ধরনের কমিটি নিয়মিতভাবে অর্থনীতির অবস্থা বিশ্লেষণ করে জনসাধারণকে অবহিত করলে বাজারে অযথা আতঙ্ক বা গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি কমবে এবং নীতি নির্ধারণেও সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছাড়াও চারজন ডেপুটি গভর্নর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
