নারীর ক্ষমতায়নে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড: ১০ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে পাইলটিং
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড: ১০ মার্চ থেকে পাইলটিং শুরু

নারীর ক্ষমতায়নে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড: ১০ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে পাইলটিং

বিএনপি সরকার নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যা একটি বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে, এবং ধাপে ধাপে দেশের সব পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিং প্রকল্প

ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কাজের অংশ হিসেবে পাইলটিং বা দিশারী প্রকল্প শুরু হয়েছে। ১৪টি স্থানে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাষানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।

সুনামগঞ্জ জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় জানান, দিরাইয়ের কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে চার সদস্যের ওয়ার্ড কমিটি ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছে। জরিপ ও ডেটা এন্ট্রির কাজ প্রায় শেষ, এবং ১০ মার্চ সুনামগঞ্জে এ কর্মসূচি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায়ও মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে, এবং ১০ মার্চ কার্ড বিতরণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জরিপ ও ডেটা এন্ট্রির কাজ সম্পন্ন হয়েছে, এবং ৯ মার্চের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণ শেষ হবে।

কার্ড বিতরণ ও উদ্বোধন

১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ফ্যামিলি কার্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ওই দিনই সুবিধাভোগীদের মুঠোফোনে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। উপকারভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে পাঁচ স্তরবিশিষ্ট কমিটি কাজ করবে, যার মধ্যে রয়েছে উপজেলা কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি, পৌর কমিটি, ওয়ার্ড কমিটি এবং সর্বোপরি মন্ত্রিসভা কমিটি।

ফ্যামিলি কার্ডের বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা

ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি একীভূত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যা ব্রাজিল, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। সরকারি নীতিপত্র অনুযায়ী, পরিবারে থাকা মা বা নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হবে, এবং কার্ডধারীর বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। কার্ডে নাগরিকের সব ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড-এ রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, এবং এই অর্থসেবা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ভূমিহীন ও গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যসংবলিত পরিবার, নারীপ্রধান পরিবার এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী (হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

অর্থ মন্ত্রণালয় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রাথমিকভাবে চার মাসের প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে ৪০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। তবে, দেশব্যাপী এই কার্ড চালু হলে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে, যা অর্থায়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে যে, নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে, তাই অর্থনীতিতে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। এছাড়া, কর–জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে দ্বৈততা এড়ানো এবং আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংস্কার

বর্তমানে দেশে প্রায় ১০০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে, যেগুলো ২৫টির মতো মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করে। এসব কর্মসূচিতে দ্বৈততা, পুনরাবৃত্তি এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড চালুর মাধ্যমে এই সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে একই ধারায় আনা হবে, যা উপকারভোগী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং সম্পদের অপচয় রোধ করবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান উভয়েই এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, ফ্যামিলি কার্ড নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তার ক্ষমতায়ন ঘটাবে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলবে।

সামগ্রিকভাবে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যদিও এর সফল বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।