সাজেদা ফাউন্ডেশনের তিন দশক: করপোরেট ফিলানথ্রপি থেকে টেকসই উন্নয়নের পথ
সাজেদা ফাউন্ডেশনের তিন দশক: করপোরেট ফিলানথ্রপির সাফল্য

সাজেদা ফাউন্ডেশনের তিন দশক: করপোরেট ফিলানথ্রপি থেকে টেকসই উন্নয়নের পথ

বাংলাদেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন জটিলতা যোগ হওয়ায় সাজেদা ফাউন্ডেশনকে নিজেদের কৌশলগতভাবে বদলাতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সন জাহেদা ফিজ্জা কবিরের সাক্ষাৎকারে এই পরিবর্তনের গল্প উঠে এসেছে।

শুরুটা গ্যারেজ স্কুল থেকে

১৯৮৭ সালে সৈয়দ হুমায়ুন কবির তাঁর বাসার গ্যারেজে দুস্থ শিশুদের জন্য একটি স্কুল শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর স্ত্রীর নামে এটিকে ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’ হিসেবে নিবন্ধন করেন। প্রতিষ্ঠাতার দীর্ঘ করপোরেট পটভূমি ছিল; তিনি ফাইজার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯১ সালে ফাইজার বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার সময় একটি চুক্তির মাধ্যমে ফাউন্ডেশনকে ৫১ শতাংশ শেয়ার দান করা হয়, যা বর্তমানে রেনাটা লিমিটেড নামে পরিচিত। এই শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোফাইন্যান্স, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অতিদরিদ্রদের উন্নয়ন, ওয়াশ ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো যুক্ত হয়ে একটি ছোট গ্যারেজ স্কুল আজ বিশাল উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

করপোরেট ফিলানথ্রপি মডেলের সাফল্য

সাজেদা ফাউন্ডেশন প্রথাগত এনজিও নয়; এটি একটি করপোরেট ফিলানথ্রপি বা স্বনির্ভরতা মডেলে পরিচালিত হয়। জাহেদা ফিজ্জা কবির বলেন, “প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটি শক্ত হতে হবে। আমাদের দেশের প্রতি আমাদের সবারই একটা দায়িত্ব আছে। এটি কোনো দানখয়রাত নয়, বরং দায়বদ্ধতা।” এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফাউন্ডেশন নিজেদের এমনভাবে কাঠামোবদ্ধ করেছে যাতে দাতাদের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না হতে হয়। মাইক্রোফাইন্যান্সের উদ্বৃত্ত আয়ের ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয় এবং রেনাটার লভ্যাংশও বড় অবদান রাখে।

সরকারি অংশীদারিত্বের গুরুত্ব

ফাউন্ডেশন শুধু সরাসরি সেবা দিতে চায় না, বরং বিদ্যমান পদ্ধতি শক্তিশালী করতে চায়। জাহেদা ফিজ্জা কবিরের মতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরির জন্য সরকারের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করা জরুরি। “সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার মধ্যে আমাদের কাজগুলোকে যুক্ত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।” উদাহরণস্বরূপ, তারা ‘খান একাডেমি’র প্রতিনিধি হিসেবে সরকারি স্কুলগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটি প্রকল্প সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাস্তবায়ন করছে।

অপ্রচলিত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ

মানসিক স্বাস্থ্য বা বয়স্কদের জন্য কেয়ার সার্ভিসের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশে মূলধারার এনজিও কার্যক্রমে ততটা গুরুত্ব পায় না। সাজেদা ফাউন্ডেশন এই অপ্রচলিত ক্ষেত্রগুলোতে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়েছে। জাহেদা ফিজ্জা কবির বলেন, “আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজি এনে মানসম্মত সেবা বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি এবং এই মার্কেট তৈরি করতে অবদান রেখেছি। আগে এসব সেবা অ্যাডহক ভিত্তিতে দেওয়া হতো, আমরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছি।” এখন অনেকেই এই বাজারে এগিয়ে আসছে, যা তাদের একটি বড় সাফল্য।

বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বাংলাদেশের বর্তমান সবচেয়ে বড় সংকট সম্পর্কে জাহেদা ফিজ্জা কবির বলেন, “প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে এবং নিয়মতান্ত্রিকতার তীব্র অভাব রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার এমন ক্ষতি হয়েছে, যেখান থেকে আমরা আর মূল্যবোধ বা নৈতিকতা শিখতে পারছি না।” তবে তিন দশকের পথচলায় তৃপ্তির মুহূর্তও রয়েছে। ১৯৯৩ সালে ৩ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার আজ বিলিয়ন ডলার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এবং এর লভ্যাংশ দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে। কোভিডের সময় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কোভিড ডেডিকেটেড প্রাইভেট হাসপাতাল চালু করা এবং জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া তাদের উল্লেখযোগ্য কাজ। আগামী দশকে তারা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কাজের দক্ষতা বাড়াতে চায়।