এম নাজিম এ চৌধুরী 'ক্যাশলেস অর্থনীতি' বিনির্মাণের লক্ষ্যে আর্থিক খাত ডিজিটাল রূপান্তরের পথে। বর্তমানে অন্যান্য সেবা খাতের পাশাপাশি আর্থিক সেবাগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আধুনিক ও ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকগুলো তাদের সেবাকে গ্রাহকের কাছে সহজলভ্য করার পাশাপাশি একে নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পেমেন্ট বা লেনদেনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ক্রেডিট কার্ড।
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজার ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজার ও এর সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এটি কেবল কেনাকাটার মাধ্যম নয়, এটি আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি বড় হাতিয়ার। ক্রেডিট কার্ডের প্রতিটি লেনদেন খুব সহজেই শনাক্ত করা যায়, যা অবৈধ লেনদেন ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এই কার্ডের ব্যবহার উৎসাহিত করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক স্বচ্ছতা আরও সুসংহত হবে। বর্তমানে দেশের মানুষের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের প্রতি যে আস্থা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা এই বাজারকে আরও বহুদূর নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রাইম ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
ডিজিটাল পেমেন্টের এই প্রসারের প্রতিফলন আমরা আমাদের ব্যাংকেও দেখতে পাচ্ছি। গত তিন বছরে প্রাইম ব্যাংকের কার্ডের ব্যবহার আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থা ও ক্যাশলেস লেনদেনে তাঁদের অভ্যস্ত হওয়ারই ফল। গ্রাহকদের জীবনযাত্রার ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে ভিসা, মাস্টারকার্ড ও জেসিবি—তিনটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডেরই বিভিন্ন ক্যাটাগরির কার্ড (গোল্ড, প্ল্যাটিনাম, ওয়ার্ল্ড ও সিগনেচার) দেশে ও বিদেশে ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য গ্রাহককে একটি আধুনিক ও নিরাপদ 'পেমেন্ট সলিউশন' দেওয়া, যাতে তাঁরা আর্থিক সিদ্ধান্তে পূর্ণ স্বাধীনতা পান।
'জিরো বাই প্রাইম ব্যাংক': ফি ছাড়াই আধুনিক কার্ড
অনেকের ধারণা থাকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার মানেই অনেক ধরনের বাড়তি ফি। এই ধারণা বদলে দিতে আমরা 'জিরো বাই প্রাইম ব্যাংক' নামে একটি বিশেষ ক্রেডিট কার্ড চালু করেছি। এটি বাংলাদেশের বাজারে একটি অনন্য ও বৈপ্লবিক উদ্যোগ। ভিসা সিগনেচার ক্যাটাগরির এই কার্ডে কোনো ইস্যুয়িং বা বার্ষিক ফি নেই। এমনকি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) ফান্ড ট্রান্সফার ফি, ওভার লিমিট ফি বা ইএমআই প্রসেসিং ফির মতো চার্জগুলোও আমাদের কার্ডে নেই। আমাদের অন্যান্য কার্ডেও বছরে মাত্র ১৫টি লেনদেনের বিনিময়ে গ্রাহকদের বার্ষিক ফি মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর বাইরে বছরজুড়েই লাইফস্টাইল অফার, ক্যাশব্যাক ও শীর্ষস্থানীয় হোটেল–রেস্তোরাঁয় 'বাই ওয়ান গেট থ্রি' পর্যন্ত বুফে অফার তো থাকছেই। এ ছাড়া বাজারের চাহিদামতো ইএমআইয়ে শূন্য সুদ ও বোনাস রিওয়ার্ড পয়েন্টস রয়েছে।
নিরাপত্তা ও গ্রাহক সচেতনতা
তবে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার যত বাড়ছে, নিরাপত্তার প্রশ্নটিও তত জোরালো হচ্ছে। সরকার ডিজিটাল লেনদেনের সুরক্ষায় ইতিমধ্যে নানামুখী নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ব্যাংকগুলোকেও গ্রাহকের তথ্য ও অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। প্রাইম ব্যাংকে অটোমেটেড প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি লেনদেন মনিটর করা হয়। আমাদের কার্ডগুলো আধুনিক ইএমভি চিপযুক্ত এবং প্রতিটি অনলাইন লেনদেন ওটিপি দ্বারা সুরক্ষিত।
প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহক সচেতনতাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিয়মিতভাবে এসএমএস ও আমাদের 'মাইপ্রাইম' অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়ে সচেতন করি। আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রচারণাও আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।
উপসংহার: ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ
পরিশেষে বলা যায়, একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ে তুলতে ক্যাশলেস লেনদেনের কোনো বিকল্প নেই। ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গ্রাহকবান্ধব ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে একদিন পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। লেখক: অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর, প্রাইম ব্যাংক পিএলসি।



