রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি: গ্রন্থে মিলনকান্তির বিশ্লেষণ
রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি: মিলনকান্তির বিশ্লেষণ

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মিলনকান্তি বিশ্বাসের লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থটি ২০২৩ সালে দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, চিন্তা ও জীবনদর্শনের সঙ্গে বাংলার লোকসংস্কৃতির গভীর সম্পর্ককে অনুসন্ধান করে। বাঙালির হাজার বছরের লোকঐতিহ্য, লোকগান, লোকবিশ্বাস, লোককথা, ব্রত, পালা কিংবা গ্রামীণ জীবনবোধ রবীন্দ্রচিন্তার অন্তঃসলিলা স্রোত হিসেবে কীভাবে কাজ করেছে, তার একটি বিশ্লেষণধর্মী পাঠ এ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে।

গ্রন্থের মূল বক্তব্য

রবীন্দ্রনাথ কেবল বিশ্বমানবতার কবি নন; তিনি ছিলেন বাংলার মাটি, মানুষ ও লোকজ সংস্কৃতিরও এক নিবিড় অন্বেষক। তাঁর সাহিত্যকর্মে যে লোকজ চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ লক্ষ করা যায়, তা বাংলা সংস্কৃতির শিকড়সন্ধানী অধ্যয়নে নতুন তাৎপর্য বহন করে। মিলনকান্তি বিশ্বাস তাঁর গবেষণামূলক আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য, প্রভাব ও পুনর্নির্মাণের দিকগুলোকে সুস্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। ফলে গ্রন্থটি শুধু রবীন্দ্রগবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলা লোকসংস্কৃতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রবন্ধসমূহ

অধ্যাপক ও গবেষক মিলনকান্তি বিশ্বাস তাঁর এ গ্রন্থটিতে ১৩টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রবন্ধগুলো হলো: রবীন্দ্রনাথ: বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে বঙ্গে লোকসংস্কৃতি চর্চা, রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য: প্রসঙ্গ ও অনুসঙ্গ, রবীন্দ্রনাথের গ্রাম-উন্নয়ন ও গ্রাম পুনর্গঠনের প্রয়াস, রবীন্দ্র সাহিত্যে সমন্বয় ভাবনা: প্রেক্ষিত বাউল গান, রবীন্দ্রনাটক: লোকসংস্কৃতির উপাদান, রক্তকরবী: লোকসংস্কৃতির আলোকে, শারদোৎসব: লোকসংস্কৃতির অনুষঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ: রথযাত্রা ও রথের রশি, রবীন্দ্রনাথের ছেলেভুলানো ছড়া: একটি ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি: গবেষণা ও চর্চার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি-চর্চা: একালের প্রেক্ষিতে, লোকসংস্কৃতি-চর্চায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অবদান ইত্যাদি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লোকসংস্কৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল সত্তা কেবল উচ্চমার্গীয় সাহিত্য বা ধ্রুপদী ধারায় সীমাবদ্ধ ছিল না; লোকজ ঐতিহ্যের গভীরেও তাঁর অবাধ বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। মিলনকান্তি বিশ্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, কবির কাছে লোকসংস্কৃতি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার সংস্পর্শে নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। কেবল নিজের সৃষ্টির প্রয়োজনে নয়, জাতীয় সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন এবং তৎকালীন তরুণ প্রজন্মকে বিলুপ্তপ্রায় অমূল্য উপাদানগুলো সংগ্রহের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

গ্রামবাংলার ছড়া, গান ও লোককথাকে তিনি সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, উদ্ধৃতিটিতে তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। রবীন্দ্রনাথ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ফলে তাঁর সৃষ্টির ও কর্মের জগৎ ছিল বহু ধারায় প্রবাহমান। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দৃষ্টি থেকে লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা এড়িয়ে যায়নি। আর পাঁচটি বিষয়ের মতো লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা তাঁর দৃষ্টিতে সেদিন ধরা পড়েছিল। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন এবং তৎকালীন একদল তরুণ সম্প্রদায়কে এই উপাদান সংগ্রহের কাজে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেছিলেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ১২)।

বাউল গানের প্রভাব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনদর্শনে বাউলের সহজিয়া তত্ত্ব ও লোকসংগীতের গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীনের ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকা লেখা এবং তাঁকে লোকসংগীত সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে কবির লোকসংস্কৃতিপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে গগন হরকরা বা লালন শাহের মতো সাধকদের দর্শনে তিনি ‘মনের মানুষ’ বা আধ্যাত্মিক সংযোগের যে সন্ধান পেয়েছিলেন, তা তাঁর ‘দ্য রিলিজিয়ন অব ম্যান’সহ বিভিন্ন প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাউল গানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল বেশি। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন কর্তৃক সংকলিত ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি বলেন, “মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন বাউল সংগীত সংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়েছেন… আমিও তাঁকে অন্তর থেকে উৎসাহ দিয়েছি” (উদ্ধৃত: শেখ মকবুল ইসলাম, ২০০৭)। লোকায়ত বাউল গানকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে উচ্চাঙ্গের দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান

দেশ-বিদেশ ভ্রমণের ফলে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। শান্তিনিকেতন আশ্রমের শিক্ষাধারায় সংগীত, চিত্র ও নৃত্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। দেশ-বিদেশের লোকনৃত্যশিল্পীদের তিনি সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ১৯)। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষায় তিনি রাখিবন্ধন উৎসব প্রবর্তন করেন। সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে এটি আজও পালিত হয়। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ছাড়াও তিনি পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ২৪)।

ছেলেভুলানো ছড়া

ছেলেভুলানো ছড়ার বৈশিষ্ট্য হলো তার স্বতঃস্ফূর্ততা, কল্পনানির্ভরতা এবং অসংলগ্নতা। ‘যমুনাতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে’ ধরনের ছড়ায় ধারাবাহিক কাহিনি না থাকলেও তা শিশুমনে আনন্দ সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ একে ‘অসংগত’ বললেও এই অসংগতিই শিশুমনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ৪৩)। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শনে প্রকৃতির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি প্রকৃতির কোলে শিক্ষা গ্রহণের ধারণা বাস্তবায়ন করেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ৬০)।

গ্রন্থের তাৎপর্য

‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, সমাজচিন্তা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাংলার লোকঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ককে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ফলে এটি রবীন্দ্রগবেষণা ও লোকসংস্কৃতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান সংযোজন। সবশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের এক চিরঞ্জীব সত্তা। তাঁর সাহিত্যকৃতির অনন্য যোগ্যতার কারণেই তিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এমন এক রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় উপমহাদেশে একবারই জন্মেছেন, আর তিনি বেঁচে থাকবেন পৃথিবীর সমবয়সী হয়ে।