রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে সংলাপ অনুষ্ঠিত
রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা সংলাপ অনুষ্ঠিত

রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অনুষ্ঠিত

আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে একটি উল্লেখযোগ্য সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে একশনএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে 'রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।

নির্বাচনে নারী অংশগ্রহণের হালচিত্র

অনুষ্ঠানে আলোচকরা উল্লেখ করেন যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। মোট ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। এই সংখ্যাগত বৈষম্য রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি নির্দেশ করে। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নারীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং বিজয়ী হওয়া রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

নারী প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা ও আহ্বান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী রুমিন ফারহানা বলেন, 'রাজনৈতিক দলগুলোর নারীবিদ্বেষ মনোভাবের উদাহরণ এবারের নির্বাচন। যে দল নারীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় না, সেই দলকে নারীরা যাতে ভোট না দেন, সে আহ্বান জানাই।' তিনি আরও যোগ করেন, পরিবারে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য না করলে সেই শিশু মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে পারে।

ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, 'আমি নারী, তাই নমিনেশন পাব কি না, এসব ভেবে অনেকে তদবির করতে বলেছেন। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল এবং ভোটাররা আস্থা রেখেছেন।'

ঢাকা–৯ আসনের প্রার্থী তাসনিম জারা গুরুত্ব দিয়ে বলেন, নির্বাচনে কত নারী অংশগ্রহণ করলেন, শুধু সেই সংখ্যা বিবেচনা না করে মন্ত্রিসভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইনে হয়রানির কারণে নারীরা রাজনীতি থেকে পিছিয়ে যান বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সাইবার হয়রানি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

অনেক নারী প্রার্থী সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ঢাকা–২০ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ বলেন, নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় তিনি সাইবার হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। পুরুষের তুলনায় নারী প্রার্থীরা বেশি হয়রানির শিকার হন এবং দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ঢাকা–১০ আসনের প্রার্থী নাসরিন সুলতানা জানান, তিনি নিজেও অনলাইন বুলিংয়ের শিকার হয়ে থানায় মামলা করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

হিজড়া ও প্রান্তিক নারীদের প্রতিনিধিত্ব

রংপুর–৩ আসনের হিজড়া প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। তিনি হিজড়াসহ প্রান্তিক নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সমাধান প্রস্তাব

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, 'এবারের নির্বাচনে বিজয়ীরা নারী হিসেবে নয়, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে কথা বলবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা। নারীর অধিকার আদায়ে সংসদে পুরুষদেরও কথা বলতে হবে, কারণ নারীরা ভোট না দিলে তারা সংসদে আসতে পারতেন না।'

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, 'নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম শর্ত হলো নারীর জন্য সহিংসতামুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। সাইবার বুলিং নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা দিয়েছে।' তিনি সংসদ ও সংসদের বাইরে নারী ককাস গঠনের ওপর জোর দেন।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, প্রথম আলো নারীদের বিষয়গুলো সব সময় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। অ্যাসিড সন্ত্রাস কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় বছরে ৫০০-এর বেশি মানুষ অ্যাসিডদগ্ধ হতেন, কিন্তু এখন তা কমে ১০-১২ জনে নেমেছে। উদ্যোগী হলে কাজ হয়, এটা তার প্রমাণ। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ অংশ নেওয়া নারীদের সম্মাননা জানান। সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীদের একশনএইড বাংলাদেশের 'হ্যাপি হোম' প্রকল্পের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েশিশুদের আঁকা ছবি উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে নাট্য সংগঠন পালাকারের সদস্যরা 'চেনা পরবাস' নামের একটি নাটক পরিবেশন করেন।

উপস্থিত অতিথিবৃন্দ

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন:

  • ব্রিটিশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন
  • ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম
  • জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ
  • একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিম লিড মরিয়ম নেসা

মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে পাবনা-৩ আসনের সরদার আশা পারভেজ, পাবনা-৪-এর শাহনাজ হক, ঝিনাইদহের মনিকা আলম, ঢাকা–৭-এর সীমা দত্ত, ঢাকা–৮-এর মেঘলা আলম, ফরিদপুর–৩-এর আরিফা আক্তার ও নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সদস্য সাদাফ সায সিদ্দীকীও বক্তব্য দেন।

এই সংলাপটি রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা প্রদান করে।