বাংলাদেশে গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা সংকট: ভিড়, হয়রানি ও সমাধানের পথ
বাংলাদেশের রাস্তাগুলো আজও নিস্তরঙ্গ নয়। প্রতিদিন সকালে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা বন্ধু-আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতে হাজারো মানুষ ট্রাফিকের ভিড় পেরিয়ে চলেন। কিন্তু এই ভিড়ে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন নারীরা। বাস, মেট্রো, লেগুনা বা যেকোনো গণপরিবহনে তাঁদের যাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র
সরকারি ও স্বতন্ত্র গবেষণা প্রকাশ করেছে কিছু হতাশাজনক তথ্য। বিভিন্ন সার্ভে ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনের সামারি থেকে পাওয়া যায়:
- ঢাকাস্থ নারীর মধ্যে ৬৩.৪ শতাংশ দাবি করেছেন যে গত ছয় মাসে গণপরিবহনে তাঁরা আচরণগত হয়রানির শিকার হয়েছেন।
- দেশব্যাপী সমীক্ষায় ৮৭ শতাংশ নারীর কোনো না কোনো সময়ে হয়রানি হয়েছে এবং ৩৬ শতাংশ নারী নিয়মিত এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
- ঢাকায় নারীর ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা গত বছরে অন্তত একবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
- কিছু গবেষণায় দেখা গেছে বাস, মেট্রো বা লেগুনায় নারীদের প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ ভ্রমণই অসম্মান বা অস্বস্তিতে ভরা।
এই সংখ্যা কেউ গোপন করছে না, বরং সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: ভিড় ও মানসিক চাপ
আমি নিজেও বহুবার এই অভিজ্ঞতা নিয়েছি। সকালে বিভিন্ন রুটের বাসে নারীরা এমনভাবে চাপা পড়ে যান যে হাতেই পা ওঠা যায় না। মেট্রোরেলের সংরক্ষিত বগিতে পুরুষদের অনুপ্রবেশ, ভিড়ে টানাপোড়েন, কানে অশালীন শব্দ—সবটাই চোখের সামনে ঘটে। লেগুনায় চলাফেরা করলে নারীরা প্রায়ই অচেনা স্বরের অশোভন মন্তব্যসহ অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ সহ্য করেন।
নারীরা ভিড়ে কখনো ঠেলাঠেলি, কখনো মানসিক চাপ অথচ মুখে একটা শান্ত ভাঁজ! তাঁদের চোখে ভয়, কিন্তু মুখে এক অশান্তি। কারণ ভয় দেখাতে হয় না, সেটা নীরবে সহ্য করেই জীবন চালিয়ে নিতে হয়। এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়, অনেক নারীই স্বীকার করেন যে তাঁরা প্রতিদিন এমন অস্বস্তি অনুভব করেন।
সমস্যার মূল কারণগুলো
- ভিড় ও ব্যক্তিগত স্পেসের অভাব: বাংলাদেশের জেলা শহরগুলোতে গণপরিবহন সর্বদা ভিড় থাকে। যেখানে প্রতিটি সিটই অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকে না, বরং দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ঠেলাঠেলিতে পূর্ণ। এমন ভিড়ে নারীর ব্যক্তিগত স্পেস থাকে না।
- আইনের দুর্বল প্রয়োগ: হয়রানির বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নেই। মামলা হয়, কিন্তু দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া, সময়, মূল্য ও সাহসের অভাবে অনেকেই মামলা করার আগে ফিরে যান।
- মনিটরিং সিস্টেমের অভাব: কিছু কিছু বাস, মেট্রো বা লেগুনায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা কার্যকরভাবে মনিটর বা ব্যবহৃত হয় না।
- ট্রেনিংয়ের অভাব: চালক, সহকারী বা পরিবহনকর্মীদের লিঙ্গ সেবাশিল্পে ট্রেনিং নেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই।
- সামাজিক মানসিকতা: বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন, ‘এটা তো ছোট ব্যাপার’ বা ‘আপনার ধারণা ভুল’—এই মানসিকতা সমস্যাটিকে ছোট করে দেয়।
সমাধানের পথ: আজই শুরু করতে হবে
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:
- নিরাপত্তা সিস্টেম শক্ত করা: বাস, মেট্রো, লেগুনায় প্রতিটি ভান্ডারে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ লাইভ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থা দৃঢ় করা যাতে নারীরা পুলিশ বা হেল্পলাইন দ্রুত পায়।
- ট্রেনিং ও সচেতনতা: চালক, সহকারীদের লিঙ্গসচেতনতা শেখানো এবং পরিবহন স্টাফদের প্রশিক্ষণ দেওয়া: সহায়তা, সহানুভূতি, নিরাপত্তা বার্তা।
- আইনে দ্রুত ফলাফল: হয়রানি–সম্পর্কিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন, সংযমহীন কিংবা অপরাধীকে কঠোর শাস্তি এবং সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- পরিবহন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ: মেয়েদের পরিবহনব্যবস্থায় পরিকল্পক, পরিচালক বা পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখা। শহর সড়ক উন্নয়ন বোর্ডে নারীর প্রতিনিধি সোচ্চার করা।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন: ‘ভয় লাগে না’
একদিন প্রতিটি নারীর মুখে যেন এই শব্দ থাকে: ‘ভয় লাগে না’। আমরা চাই নারীরা যেন হাসিমুখে বাসে ওঠে, মেট্রোয় চড়ে, লেগুনায় বসে যেন তাঁদের যাত্রা নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানসম্মত হয়। হারিয়ে যাক ভিড়ের চাপ, অশালীন মন্তব্য, অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ আর রুখে দাঁড়াক সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের আলোয়। এটা শুধু সংস্কার নয়, এটা মানবিক দায়বদ্ধতা।
বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়ন করছে, কিন্তু নিরাপদ গণপরিবহন এবং নারীর নিরাপত্তা উন্নয়নের পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য পূরণ করা এখনো বাকি। আপনার, আমার, আমাদের সবার উদ্যোগের ফলে যদি একদিন এ দেশটি এমন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে যেখানে নারীরা ভিড় না ভয়ে, নিরাপদে ও হাসিমুখে চলাচল করতে পারে, সেটা হবে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি।
