ঢাকায় নিরাপদ টয়লেটের সংকট: শক্তিকন্যার অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভাবন
ঢাকা, একটি জনবহুল মহানগরী যেখানে প্রতিদিন কোটি মানুষের চলাচল ঘটে। কিন্তু এই শহরের ব্যস্ততা ও ভিড়ের মধ্যে একটি পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট খুঁজে পাওয়া এখনো অনেকের জন্য বিলাসিতার মতো। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিন তরুণ নারী স্থপতির কাছে এটি শুধু শহরের একটি সাধারণ সমস্যা নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের তিক্ত ও চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই জন্ম দিয়েছে ‘টিম শক্তিকন্যা’ নামের একটি উদ্যমী দলের।
অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা: নারীদের দৈনন্দিন সংগ্রাম
শক্তিকন্যার সদস্যরা—জান্নাতুল ফেরদৌস, লামিয়া ফারিহা এবং মাহমুদা হক মুন—সবাই স্থপতি এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। তারা বলেন, “আমরা শুধু নারীদের নিয়ে দল গড়িনি; বরং নারী হিসেবে একই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে একত্রিত হয়েছি।” সহকর্মী ও ছাত্রীদের সঙ্গে আড্ডায় বারবার উঠে আসত একটি সমস্যা: ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব, যা প্রতিদিনের চলাচলকে ভোগান্তিময় করে তোলে। বিশেষ করে নির্মাণস্থল বা কনস্ট্রাকশন সাইটে নারীরা নিরাপদ টয়লেট না থাকায় দ্বিধা বোধ করেন, এবং পিরিয়ড চলাকালীন এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও বিজয়: একটি মাইলফলক
এই বাস্তবতাই তাদের উৎসাহিত করে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘BLUE’ প্ল্যাটফর্ম এবং সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘টয়লেটস অন দ্য গো’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সারাদেশ থেকে ৪০টি আবেদন জমা পড়েছিল, এবং কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে ১২টি দল জুরি বোর্ডের সামনে তাদের উদ্ভাবনী কনসেপ্ট উপস্থাপন করেছিল। শক্তিকন্যা সেখানে বিজয়ী হয়, যা কেবল একটি পুরস্কার নয়; এটি নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নাগরিক স্যানিটেশনকে আরও নিরাপদ ও মর্যাদা সম্পন্ন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পুরস্কার হিসেবে তারা পান এক লাখ টাকা এবং তাদের ডিজাইন ‘Loo.ext’ এর পূর্ণ অধিকার। তবে বিজয়ী হওয়ার পর তারা উল্লাসে নয়, বরং দায়িত্ববোধ অনুভব করেন, কারণ এই ডিজাইনটি বাস্তবায়ন করলে শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিবর্তিত হবে।
Loo.ext: সম্মান ও সমতার নতুন মডেল
‘Loo.ext’ কেবল একটি টয়লেট নয়; এটি একটি নিরাপদ, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলযুক্ত এবং নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত করা আধুনিক মডিউল। এটি অফিস এলাকা, বাজার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জনবহুল স্থানে বসানো হবে। রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন প্রশিক্ষিত নারী কর্মীরা, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সুযোগ করে দেবে।
এতে থাকবে ছোট খুচরা কাজ—যেমন নিউজপেপার স্ট্যান্ড বা ফুলের দোকান—যাতে মানুষ এটিকে শহরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এটি শুধু টয়লেটের চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে দেখা হয়। শক্তিকন্যার মতে, “স্যানিটেশন মানে শুধু টয়লেট নয়; এটি সমতা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনপরিসরে বিচরণ করার অধিকার।”
শক্তিকন্যা: একটি প্রতিচ্ছবি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন
শক্তিকন্যা কেবল একটি দলের নাম নয়; এটি সাহসী নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা শহরের সবচেয়ে জরুরি কিন্তু অবহেলিত প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে ঢাকাকে নতুনভাবে গড়তে চায়। তাদের এই উদ্যোগ শুধু স্যানিটেশন উন্নয়নে নয়, বরং নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকেও একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে তারা আশা করেন যে ‘Loo.ext’ মডেলটি ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হবে, যা নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
