ধর্ষণের বিরুদ্ধে একজন মা ও শিল্পীর হৃদয়বিদারক আহ্বান
ধর্ষণপ্রতীকী ছবি বা ধর্ষণের প্রকৃত অর্থ বোঝার আগেই আমরা শিশু অবস্থাতেই খবরের কাগজে প্রতিদিনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো পড়তে শিখেছি। সেই আতঙ্ক নিয়েই বড় হয়েছি, আর আজ মা হয়ে প্রতিদিন ও প্রতি রাত ভয়ে কাঁটা হয়ে জীবন কাটাচ্ছি। এখন বুঝতে পারছি, আমার মাও কী ভয়াবহ দুঃসহ চিন্তায় তাঁর জীবন কাটিয়েছেন! কয়েক দিন ধরে লাগাতার ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমাকে মানসিকভাবে তীব্র যন্ত্রণায় ফেলেছে, এমনকি রাতে ঘুমের ওষুধও কাজ করছে না। মেয়ে যখন কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে থাকে, তখন আমি পাঁচ–ছয়বার কল দিয়ে ফেলি, বকাও খাই, কিন্তু থামতে পারি না।
রাজনৈতিক পটভূমিতে নারীর বলি হওয়ার চিত্র
প্রতিবার রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বলি হন নারীরা, এবং এর মধ্যে ধর্ষণ একটি বিশেষ বলি হিসেবে কাজ করে। জমি নিয়ে গ্যাঞ্জাম, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, দুই পুরুষের আগের ঝগড়া, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমি দখল বা পুলিশি হেফাজতসহ নানা ইস্যুতেই প্রথম শিকার হন নারী ও কন্যা ধর্ষণ। এবারের দফাটা হতে পারে জামায়াত বা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের, অথবা নব্য সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রয়াস। কিন্তু সরকারি মোরাল পুলিশিংও একই কাজ করে যাচ্ছে, যেমন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি মেয়ের ভিডিও ভাইরাল করে তার ব্যক্তিজীবন ও ছাত্রজীবনকে সামাজিকভাবে চরম অপমানের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি
আমার বক্তব্য আজ মূলত ধর্ষকদের নিয়ে। সরকারের এক ফোনকলে এক ঘণ্টায় ভালো কিছু হতে পারলে, এক দিনেই ধর্ষকদের ধরে আইনের আওতায় এমন শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত, যা জানার পর এই দেশে আর কেউ এই দুষ্কর্ম করার সাহস করবে না। সমালোচকদের বিরুদ্ধে না গিয়ে সমালোচনা নেওয়ার আগ্রহ রাখুন, আশপাশে মোসাহেবদের ভিড়তে দেবেন না, এবং সাংবাদিকদের সাহসী প্রশ্ন করতে দিন। সাবেক সরকারপ্রধান হাসিনার সব পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করুন, নিজ দলের লোক হলেও ধর্ষক হিসেবেই চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করুন।
শিক্ষাব্যবস্থায় যৌনশিক্ষা ও মানবিকতার গুরুত্ব
আমরা যখন যৌনশিক্ষা, মানবিক শিক্ষা এবং নারীর প্রতি মর্যাদার শিক্ষা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগের কথা বলি, তখন একদল ছি ছি করে ধর্মের নামে পেঁচিয়ে ধরে এবং আমাদের যৌনকর্মী বলে। আমরা হয়তো মূর্খের কথা গায়ে মাখি না, কিন্তু রাজনীতির ক্ষমতাকে টেকাতে গিয়ে উগ্রবাদীদের তোষণে দুটি বিষয় ঘটে: প্রথমত, এই কূপমণ্ডূকতার সমাজ টিকেই থাকে এবং উগ্রবাদীরা জয়ী হয়; দ্বিতীয়ত, মানুষের মানবিক বিকাশ ঘটানো, যা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়, সেটা ঘটে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে উগ্রবাদীদের তোষণ করার ফলেই আজ তাদের উল্লম্ফন প্রকাশ্য, এবং বিএনপির বরাবর সব ক্ষেত্রে সামরিক কায়দা জারি ও একই তোষণনীতির ফলে দেশে কেউই মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
জনগণের জয় ও সরকারের দায়িত্ব
সম্পাদক নূরুল কবীরের কথাটি প্রতি পদক্ষেপে মনে রাখতে হবে: ‘মানুষ নাকে রুমাল দিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।’ মানুষ উগ্রবাদীদের হারিয়েছে, তাই এবার আপনাদের জয় নয়, বরং জনগণের জয়। আর তাই এই সরকার জনগণের সব ধরনের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য। সেখানে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য হলে এখনই ক্ষিপ্র পদক্ষেপ নিতে হবে, এবং একই সঙ্গে অপারেশন ক্লিনহার্ট না করে, র্যাবের জন্ম না দিয়ে, জনমনে ভীতির সঞ্চার না করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। ধর্ষণের পর খুন, গলা কাটা অবস্থায় হেঁটে চলা শিশুকন্যা ও পরবর্তীতে তার মৃত্যু, দাদি–বাপ–ভাইয়ের খুন—এসব ঘটনার ইতি টানুন। নৃশংস, নোংরা ও কুৎসিত পৃথিবীকে সবুজ, সুন্দর ও মানবিক বানানোর দায় বোধ করুন, সেটাই হবে ক্ষমতায় টিকে থাকার সহজ প্রক্রিয়া।
