রমজানে বাদামতলী ফলের বাজারে প্রতিদিন শতকোটি টাকার লেনদেন
রমজানে বাদামতলীতে প্রতিদিন শতকোটি টাকার লেনদেন

রমজানে বাদামতলী ফলের বাজারে প্রতিদিন শতকোটি টাকার লেনদেন

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাদামতলী ফলের বাজার রমজান মাসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। ইফতারের জন্য পুষ্টিকর ফলের চাহিদা মেটাতে এই বাজার এখন জমজমাট। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফল বাজার হিসেবে পরিচিত বাদামতলীতে প্রতিদিন প্রায় দুইশত থেকে তিনশত কোটি টাকার বেচাকেনা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের ৪৬ দেশ থেকে আমদানি

বাদামতলী বাজার বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে খেজুর, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি, ডালিমসহ বিভিন্ন ফল আমদানি করে। এখান থেকে পণ্য কিনে সরবরাহ করা হয় সারা দেশে। ফলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়, বাকি ৩০ শতাংশ ভারত থেকে স্থলপথে সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বুড়িমারী ও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আনা হয়।

খেজুরের দাম ওঠানামা

রমজানে খেজুরের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী মো. জুয়েল হাওলাদার জানান, খেজুরের কার্টনগুলো সাধারণত ৫/১০ কেজির হয়ে থাকে। ৫ কেজির মেডজুল ৫,৫০০ টাকা, প্রিমিয়ার জার্বো মেডজুল ৭,০০০ টাকা, মরিয়ম ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, আজওয়া ৩,০০০–৫,০০০ টাকা, মাবরুম ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, মাশরুখ ২,০০০–২,৫০০ টাকা, কালমি ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা, সুগাই ২,৮০০–৩,৫০০ টাকা, ছড়া ২,৫০০–২,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে জিহাদি খেজুরের, গত বছর ১০ কেজি কার্টনের দাম ছিল ১,৭০০ টাকা, এবার তা হয়েছে ২,৭০০ টাকা।

ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. নোমান বলেন, "রমজান এলেই বাজারের চিত্র বদলে যায়। ছোট দোকান চালানোর মানুষেরা এই সময় বেশি খেজুর কিনে রাখেন।" সাথী ফ্রেশ ফ্রুটসের পরিচালক মো: সাইফুল ইসলাম শান্ত জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতাদের উপস্থিতি ভালো, এবং অন্তত ১৫ রোজা পর্যন্ত বাজারের গতি ধরে রাখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ৩৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ ফরহাদ রানা বলেন, "বাদামতলী ফলের বাজার থেকে সরকার শতকোটি টাকা রাজস্ব পায়। সরকারের উচিত এই সম্ভাবনাময়ী বাজারকে যানজটমুক্ত করে আধুনিক এবং ব্যবসায়ী বান্ধব করা।" তিনি আরও সতর্ক করেন, নতুন সরকার যদি এখনই বাজারের লাগাম টানতে না পারে, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ক্রেতাদের মতামত

ফল কিনতে আসা শাহাদাৎ হোসেন খান শরীফ বলেন, "এবার ফলের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে খুচরা বাজারের তুলনায় এখানে দাম কিছুটা কম এবং এক জায়গায় এত ধরনের খেজুর পাওয়া যায়।" ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা মো: নয়ন মিয়া দেশি ফলের দামও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন, তরমুজ প্রতি কেজি ১০০–১২০ টাকা, পেঁপে ১৭০–১৮০ টাকা, পেয়ারা ১৬০ টাকা, এবং বিদেশি ফল যেমন বেদানা ৫২০–৫৬০ টাকা ও স্ট্রবেরি ৬০০–৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মান বজায় রাখা

ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম নিশ্চিত করেন যে, বাজারে মান বজায় রাখতে মেয়াদোত্তীর্ণ বা পচা খেজুর বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খেজুরকে মেঝেতে সরাসরি রাখা যাবে না, কাঠের তক্তা বা চাঁটাই বাধ্যতামূলক। এছাড়া পরিমাপের স্কেল ব্যবহার, মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং বিক্রির মেমো সংরক্ষণও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাদামতলী বাজারের এই প্রাণচাঞ্চল্য রমজান জুড়ে অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন ভোর রাত থেকেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ এবং শতকোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে।