আগামী পরশু পরীক্ষা আয়োজনের সব কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। ফিরতি পথের এ সময়টুকু একান্ত আমার। সড়কের ব্যস্ততা, হর্নের অস্থিরতা, লোকজনের ছোটাছুটি, হকারের হুল্লোড়—সবকিছু ছাপিয়ে এক অলৌকিক ভাবনায় ডুব দিয়েছি। শুধু বিজয় সরণির জেব্রাক্রসিংয়ে ছোট্ট ফুল বালিকার বেলির মালাগুচ্ছ আমাকে নস্টালজিক করে তোলে—আমার দুহাত ভরে যায় ফুলে, আপ্লুত হই।
মহাকাশ ভ্রমণ ও নীহারিকার স্পর্শ
সূর্য যেন তার সবটুকু হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামকে পুড়িয়ে ফেলার প্রতিযোগিতায় নেমেছে আজ। অতঃপর কোনো এক সুপারনোভার বিস্ফোরণ। আশ্চর্য সুন্দর, রঙিন ধূলিকণার চাদর মেখে আমি মহাকাশে নীহারিকার নৈকট্য গ্রহণ করি। মহাকাশীয় তরঙ্গে ভেসে আসে অপার্থিক কোনো সংগীত। সে তরঙ্গ মস্তিষ্ক, শরীর ছুঁয়ে স্বর্গের সুবাতাস সৌরভে এক কল্পলোকের ভালো লাগা ও ভালোবাসার কাহিনি আমাকে বলে যায়। যেন চারিদিক এক অদ্ভুত আঁধারে ঢেকে গিয়ে ওখান থেকে কেউ বলছে, ‘তুমি কেমন আছ?’
কই, দেখছি না তো কিছু, তারকামণ্ডল, মেঘরাশি, নক্ষত্র, উল্কাপিণ্ড অবিরত ছুটে চলছে। কত শত গ্যালাক্সি। মিল্কিওয়ের কিছু দূরে অ্যান্ড্রোমিডাও আছে দেখছি। কুইপার বেল্টের অতিনিকটে প্লুটোও তার অবস্থান ঠিক রাখার অবিরত চেষ্টায় রত, ব্ল্যাকহোলের ওপারে আসলে কিছু নেই। নাকি সেখানটাতে এক অজানা অপার বিস্ময়।
বোশেখ দিনের স্মৃতি
মিষ্টি সুবাসে মাতোয়ারা চারিদিক। আমি তো এ সুবাস চিনি। আমার ছেলেবেলা, সেই বাসা, সেই সরকারি কলোনি, মাঠ, রাস্তা পেরিয়ে নদী, রঙিন দিন, জীবনের কত আয়োজন। কাঁঠালচাঁপা বেলি আর হাসনাহেনার মিশেল নস্টালজিক এক ঘ্রাণ। এমন বোশেখ দিনে খুব সকালে মেজ আপা ফুলদানিতে তুলে দিত, কী মিষ্টি ঘ্রাণের ফুলগুলো। আম্মা সকালে পান্তার সঙ্গে রাখতেন কাঁচা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, ইলিশ, নানা ধরনের ভর্তা, দুপুরে একটু পোলাও-মাংস আর ঘন দুধ নারকেল-গুড়ের পায়েসটাও রাঁধতেন বেশ। তার ম–ম গন্ধ রুম ছাড়িয়ে সিঁড়িতলা।
আব্বা পান্তা খেতেন না। তবে এসব আয়োজন ভীষণ উপভোগ করতেন। চোখমুখে প্রশান্তির ছায়া। পরিপাটি, গোছানো—সবকিছুতেই আব্বার ছিল পরিমিতিবোধ, পরিচ্ছন্নতাবোধ। বিশেষ আয়োজন মানে সুন্দর পোষাক, পারফিউম, খাবারে নানা আয়োজন আর সবাই মিলে উপভোগ। পরিবার মানে তাঁর কাছে বৃহত্তর পরিবার, সবার মেলবন্ধন, সবার আনন্দ।
টেলিপ্যাথি ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যা
এমন একলা চলা বিষণ্ন মধ্যাহ্ন, নস্টালজিক আবহ। আমি কি টাইম ট্রাভেল করছি, নাকি টেলিপ্যাথি, না মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন? সেই আয়োজন, সেই ঘ্রাণ, সেই আবহ এই গনগনে মধ্যদুপুরের ব্যস্ত রাস্তায় কে নিয়ে এল। তিনি বললেন, তোমাদের ছেড়ে আসা পৃথিবীর ঘ্রাণ নিতে আমি অপেক্ষায় থাকি। বুঝতে পারো... মাথার ভেতর শুধু একটা বোধ কাজ করে, কে আমায় জাগায়, কে ভাবায় প্রতিনিয়ত। কখনো বর্তমান থেকে অতীতে, কখনো ভবিষ্যতে। ইথারে ছড়িয়ে যায় আমার বোশেখ দিনের এই বোধ, ভালোবাসা, শুভেচ্ছা তাঁর জন্য।
টেলিপ্যাথি যোগাযোগের ব্যত্যয় ঘটায়নি একটুও, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কী সুন্দর ব্যাখ্যা সাজিয়ে কত কিছু কানে কানে বলে দিয়ে গেল। থিউরি অব এভরিথিং অনুভবে প্রখর। তাই তো এমন দিনে তাঁর পা ছুঁয়ে একটু সালাম করি, অনুভূতিগুলোর ডালা ছড়িয়ে দিই এখানে–সেখানে আকাশে-মহাকাশে।
বাবার ঘ্রাণ নিয়ে ফেরা
‘আপা, গ্যাটের ভিত্রে যামু?’ বললাম, ‘ও হ্যাঁ, যাও।’ ড্রাইভার আমাকে ড্রপ করল, আমি ফিরে এলাম আমার বাবার ঘ্রাণ নিয়ে। আসর ওয়াক্ত ঘনিয়ে এল। আব্বার শুভ্র পাঞ্জাবিতে খানিকটা আতরের একটু সুবাস ছড়িয়ে দিই…। যে সুবাস তাঁর ঘরে ফেরার অপেক্ষার মিষ্টি একখানা বার্তা দিয়ে যায়।



