বৈশ্বিক জিন্স উৎপাদন প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি পিস। একটি জিন্স প্যান্ট পরার আগে কেউ ভাবে না, এই কাপড়টা আসলে কতটা পানি খেয়ে তৈরি হয়েছে। গড়ে একটি জিন্সের পেছনে ৭ থেকে ১০ হাজার লিটার পানি খরচ হয়। কোনো কোনো হিসাবে এই সংখ্যা ১৫ হাজার পর্যন্ত উঠে যায়। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন তিন লিটার পানি পান করেন, তাহলে একটি জিন্স তৈরির পানি দিয়ে তিনি প্রায় ৯ বছর চালিয়ে দিতে পারবেন। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, এত পানি যায় কোথায়?
তুলা চাষ: পানির সবচেয়ে বড় গ্রাস
জিন্সের যাত্রা শুরু হয় তুলাগাছ থেকে। ডেনিম কাপড়ের মূল কাঁচামাল হলো কটন বা তুলা। আর তুলা পৃথিবীর সবচেয়ে পানিখেকো ফসলগুলোর একটি। এক কিলোগ্রাম তুলা উৎপাদনে প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি। একটি জিন্স বানাতে লাগে গড়ে ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কিলোগ্রাম তুলা। শুধু তুলা চাষেই চলে যায় মোট পানির ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ।
তুলাগাছ শুষ্ক আবহাওয়ায় জন্মায়, কিন্তু ফলন বাড়াতে বিস্তর কৃত্রিম সেচ দিতে হয়। বিশ্বের মোট কৃষিজমির মাত্র আড়াই শতাংশে তুলার চাষ হলেও এটি বৈশ্বিক কৃষি সেচের প্রায় ১৭ শতাংশ পানি টেনে নেয়। মধ্য এশিয়ার আরাল সাগর একসময় পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। সোভিয়েত আমলে তুলার সেচে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে সেই সাগর আজ প্রায় মৃত।
সুতা থেকে কাপড়: রং করার প্রক্রিয়ায় পানি
তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়—এই রূপান্তরে সরাসরি পানির ব্যবহার তুলনামূলক কম। কিন্তু কাপড়কে ডেনিমের চেনা নীল রং দিতে গেলেই শুরু হয় আসল পানিনিবিড় পর্ব। ডেনিমের রং আসে ইন্ডিগো ডাই থেকে। এখন বেশির ভাগই কৃত্রিমভাবে তৈরি। সুতায় রং চড়ানোর প্রক্রিয়াটির নাম ইন্ডিগো ডাইং। এই পদ্ধতিতে সুতাকে বারবার ইন্ডিগো দ্রবণে চুবিয়ে তুলতে হয়। প্রতিবার চুবানোর পর বাতাসে শুকিয়ে আবার ডোবানো হয় রঙে। গভীর নীল রং পেতে এই চক্র ১৫ থেকে ২০ বার পর্যন্ত চলে। প্রতিটি চক্রে পানি লাগে। রং ধরানোর পর অতিরিক্ত রং ধুয়ে ফেলতে লাগে আরও পানি। এই পুরো ডাইং প্রক্রিয়ায় একটি জিন্সের জন্য গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানি শুধু রং করার কাজেই শেষ হয়।
ওয়েট প্রসেসিং: আরও পানি অপচয়
কাপড় তৈরির পর আসে ওয়েট প্রসেসিং। কাপড়কে নানা রাসায়নিক দিয়ে শোধন করা হয়। কখনো নরম করতে, কখনো সংকোচন রোধ করতে। প্রতিটি রাসায়নিক প্রয়োগের পর প্রচুর পানিতে ধোয়া লাগে। এরপর আসে ডেনিমের আরেকটি ধাপ—ওয়াশিং ও ফেডিং। বাজারে যে জিন্স দেখা যায় একটু পুরোনো ধাঁচের, হালকা রঙের, ছেঁড়া-ফাটা ভাব—সেগুলো আপনা থেকে হয় না। কারখানাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই চেহারা তৈরি করা হয়। এর জন্য ব্যবহার করা হয় স্টোনওয়াশিং পদ্ধতি—বড় ড্রামে জিন্সের সঙ্গে পিউমিস পাথর ঘুরিয়ে কাপড় ঘষে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি জিন্সের জন্য ১০০ থেকে ২০০ লিটার পানি যায়। অ্যাসিড ওয়াশ, এনজাইম ওয়াশ, ব্লিচ ওয়াশ—প্রতিটি পদ্ধতিতে পানির চাহিদা আলাদা। কিন্তু সবগুলোতেই পানি লাগে প্রচুর।
লুকানো পানির হিসাব
পানির এই হিসাব শুধু কারখানার পাইপ থেকে বের হওয়া পানি নয়। বিজ্ঞানীরা এই পুরো বিষয়টিকে বলেন ভার্চুয়াল ওয়াটার বা এমবেডেড ওয়াটার। কোনো পণ্য উৎপাদনের পুরো চেইনে যে পানি ব্যবহৃত হয়, সেটাই ভার্চুয়াল ওয়াটার। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টনি অ্যালান আশির দশকে এই ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পণ্যের মধ্যে লুকানো থাকে অনেক পানি, যা আমরা দেখি না।
দূষণ ও পরিবেশগত প্রভাব
পানির ব্যবহারের পাশাপাশি আছে দূষণের প্রশ্ন। ডেনিম কারখানার বর্জ্য পানিতে থাকে ইন্ডিগো রং, ভারী ধাতু ও ব্লিচিং রাসায়নিক। পরিশোধন ছাড়া এই পানি নদীতে পড়লে জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়। চীনের জিনতাং অঞ্চলকে বলা হয় পৃথিবীর জিন্স রাজধানী। এখানে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার রঙিন বর্জ্য পানি আশপাশের নদীতে মিশেছে বছরের পর বছর। স্থানীয় বাসিন্দারা একসময় আগামীকাল কোন রঙের জিন্স তৈরি হবে, তা নদীর রং দেখেই বলে দিতে পারতেন!
পরিবর্তন আসছে, তবে ধীরে
বিখ্যাত ডেনিম ব্র্যান্ড লেভিস (Levi's) তাদের ওয়াটারলেস প্রযুক্তিতে কিছু প্রক্রিয়ায় পানির ব্যবহার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে বলে দাবি করে। ওজোন ওয়াশিং, লেজার ফেডিং, আবদ্ধ পানি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা—এই পদ্ধতিগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু বৈশ্বিক জিন্স উৎপাদন প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি পিস। প্রযুক্তিগত উন্নতি হচ্ছে ঠিকই, তবে এই বিপুল সংখ্যার সামনে সেটি এখনো অপ্রতুল। পানির সংকট যত গভীর হবে, এই প্রশ্নটা ততই সামনে আসবে—একটি প্যান্টের আসল দাম কত?



