ম্যাগসম্যানের সাশ্রয়ী ভ্রমণের ৭ কৌশল
ম্যাগসম্যানের সাশ্রয়ী ভ্রমণের ৭ কৌশল

বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে ভিডিও তৈরি করেন ‘ম্যাগসম্যান’ নামে পরিচিত হোসাইন শরিফ। দেশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। ছুটিছাটা নিয়ে আগে ঘুরতে যেতেন। কিন্তু এতে ভ্রমণের তৃষ্ণা মেটেনি। তাই গত ৭ জানুয়ারি চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ ছেড়েছেন। শুরু করেছিলেন থাইল্যান্ড ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। মাঝে এপ্রিলে ভিসা সংক্রান্ত কাজে বাংলাদেশে যেতে হয়েছিল। বর্তমানে মাসখানেক ফিলিপাইনে আছেন। ঘুরতে ঘুরতে ভিডিও করছেন।

ফেসবুকে তাঁর ভিডিও ও ছবির কমেন্টে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে—আপনি এত ঘোরেন কীভাবে? আরও সহজ করে বলতে গেলে, ঘোরাঘুরির মতো টাকা কোথা থেকে পান? সত্যি বলতে, ঘোরাঘুরির জন্য খুব বেশি টাকা খরচ করেন না। তাহলে কীভাবে ঘুরছেন? জানাচ্ছেন সেই গল্প।

১. ব্যাকপ্যাকিং ট্রাভেল

হোসাইন শরিফ একজন ব্যাকপ্যাকার ট্রাভেলার। ব্যাকপ্যাকিং মানে তাঁর একটা মাঝারি আকারের ব্যাগ থাকে। এই ব্যাগের মধ্যে থাকে প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, জুতা, ক্যামেরা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, টাকাপয়সা আর পাসপোর্ট। এই ব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ান। এতে অনেক স্বাধীনতা, আর খরচও কম হয়। যেকোনো জায়গায় থাকতে পারেন, সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারেন এবং স্থানীয়দের মতো জীবন যাপন করা যায়। এতে খরচ কমে, টাকা সাশ্রয় হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. হোস্টেলে থাকি

সব সময় হোস্টেলে থাকেন। এটা অনেক সস্তা। সাধারণত একটি হোস্টেলে ৫ থেকে ৭ ডলারের মধ্যে এক রাত থাকা যায়। কোনো কোনো জায়গায় ৩ থেকে ৪ ডলারের হোস্টেলও পাওয়া যায়। অথচ একটি হোটেলে ২০-২৫ ডলার খরচ হয়। হোস্টেলে থাকলে অনেক ট্রাভেলারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, যাঁরা তাঁর মতোই ব্যাকপ্যাকার এবং নানা দেশ থেকে আসেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন, গল্প করেন, অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং তাঁদের কাছ থেকে শিখেন। এভাবে নতুন নতুন জায়গা সম্পর্কে ধারণা পান এবং পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনাও সহজ হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৩. ভলান্টিয়ারিং

বিদেশে এসে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি কিছু কাজ করা যায়; এতে আয় না হলেও থাকা-খাওয়া ফ্রি পাওয়া যায়। এটাকে বলা হয় ভলান্টিয়ারিং। হোসাইন থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় হোস্টেলে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। কাজগুলো সাধারণত রিসেপশনে সাহায্য করা, গেস্ট চেক-ইন, তাঁদের সহায়তা করা, বিকেলে বা সন্ধ্যায় ঘুরিয়ে দেখানো, কিংবা গার্ডেনিংয়ে সাহায্য করা—এ ধরনের কাজ। এতে থাকা-খাওয়ার খরচ বাঁচে, স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়।

৪. হিচহাইকিং

হোসাইন হিচহাইকিং করেন। এর মানে হলো, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে কোনো গাড়ি থামিয়ে লিফট নেওয়া। চালককে অনুরোধ করেন, এই জায়গায় যাচ্ছি, আমাকে কি সেখানে নামিয়ে দিতে পারবেন? তিনি কোনো টাকা দিতে পারেন না। অনেক সময় তাঁরা রাজি হন। এটি বিশ্বের অনেক দেশে জনপ্রিয় ভ্রমণপদ্ধতি। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকাসহ অনেক জায়গায় এটি প্রচলিত। এশিয়াতেও এটি করা যায়। তাঁর নিজেরও হিচহাইকিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে। অনেক সময় এতে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, পরবর্তী সময়ে তাঁদের শহরে গিয়ে থেকেছেন, এমনকি তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটিয়েছেন।

৫. লেব্যাক ট্রাভেলিং

তিনি খুব ধীরে ভ্রমণ করেন। সাধারণত পাঁচ দিনে পাঁচটা শহর না ঘুরে, এক শহরে এক থেকে দুই সপ্তাহ থাকেন। এতে শহরটি ভালোভাবে বোঝা যায়, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে পারেন, ভিডিও বানানোর সময় পান এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। তখন হাঁটা বা লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে সহজেই ঘোরা যায়। ফলে খরচও কমে যায় এবং অভিজ্ঞতাও ভালো হয়।

৬. অপ্রয়োজনীয় খরচ করি না

ভ্রমণে গিয়ে অনেকে কেনাকাটা করেন, কিন্তু তিনি সেটা এড়িয়ে চলেন। কিছু কেনার আগে ভাবেন—এটা কি সত্যিই দরকার? ব্যাগে জায়গা আছে কি? দামি রেস্তোরাঁ, কফি শপ বা বার এড়িয়ে চলেন। সাধারণত রাস্তার খাবার খান বা হোস্টেলের কিচেনে রান্না করেন এবং অন্যদের সঙ্গে খাবার শেয়ার করেন। বেশি ফল, জুস আর সবজি খান। এতে খরচ কমে এবং স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

৭. মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করি

ভ্রমণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় টাকা নয়, মানুষ। আপনি যত মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তত বেশি সাহায্য পাবেন। স্থানীয়রা আপনাকে পথ দেখাবে, তথ্য দেবে, সমস্যা হলে সাহায্য করবে। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে ভ্রমণ সহজ হয়। তাদের সংস্কৃতি, নিয়ম-কানুন সম্মান করলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হয়। অনেকে মনে করেন, ভ্রমণের জন্য অনেক টাকা লাগে। হোসাইন বলবেন, টাকার প্রয়োজন আছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। সবচেয়ে দরকার সাহস, পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করতে পারলে এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে ভ্রমণ শুধু সহজই নয়, অনেক বেশি আনন্দদায়কও হয়।