কক্সবাজার সৈকতে সূর্যাস্তের ছায়ায় ইফতার, পর্যটকদের মিলছে প্রশান্তির মুহূর্ত
কক্সবাজার সৈকতে সূর্যাস্তের ছায়ায় ইফতার

কক্সবাজার সৈকতে সূর্যাস্তের ছায়ায় ইফতারের মোহনীয় দৃশ্য

ধু ধু বালিয়াড়ি, নীল সমুদ্রের অবিরাম ঢেউয়ের গর্জন আর গোধূলিরাঙা আকাশের নিচে সাজানো শরবত, ফলমূল ও নানা পদের ইফতারসামগ্রী। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের উখিয়ার সোনারপাড়া-পাটোয়ারটেক সৈকতে এমন দৃশ্য এখন নিয়মিত চোখে পড়ছে। পবিত্র রমজান মাসে সৈকতে বসে ইফতার দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যেখানে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে রোজা ভাঙছেন।

সৈকতজুড়ে ইফতারের প্রস্তুতি ও পর্যটকদের উৎসাহ

গত বুধবার বিকেল চারটায় সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্টে দেখা গেছে, বালিয়াড়িতে সাতটি দল ইফতারের আয়োজন করছে। প্রতিটি দলে ১০ থেকে ১৫ জন নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন, যারা বাড়ি বা দোকান থেকে আনা তরমুজ, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজু, জিলাপি, মুড়ি, শসা, টমেটো, গাজর ও ফলমূল কেটেকুটে প্রস্তুত করছিলেন। শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা সাকিবুল হাসান বলেন, ‘ঘরে সব সময় ইফতার করা হয়, কিন্তু উন্মুক্ত সৈকতে গোল করে বসে গল্প-আড্ডা দিতে দিতে ইফতার করতে ইচ্ছা হয়। তাই চলে এলাম।’ তরুণী ইসরাত জাহান যোগ করেন, ‘সমুদ্রের ঢেউ আর সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার করতে অন্য রকম শান্তি মেলে।’

হোটেল-রিসোর্টের বিশেষ উদ্যোগ ও ছাড়

কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্রগুলো কোলাহলমুক্ত এবং হোটেলমালিকেরা ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড় দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা মানসিক প্রশান্তি খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এই সময় সেরা।’ তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট বিশেষ ইফতারির প্যাকেজ ঘোষণা করে সাড়া পাচ্ছে। মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতে মারমেইড বিচ রিসোর্ট ২৫ প্রকারের ব্যুফে ইফতারির আয়োজন করেছে, যেখানে স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকরা অংশ নিচ্ছেন।

পর্যটন ব্যবসা সচল রাখার চ্যালেঞ্জ ও পরামর্শ

কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার মন্তব্য করেন, রমজান মাসে পর্যটন ব্যবসা সচল রাখা চ্যালেঞ্জিং হলেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে কার্যকর উপায় আছে। তিনি বলেন, ‘বিশেষ ছাড়ে হোটেল থাকার সুযোগ, আর্থিক সংকটে থাকা পর্যটকদের বিনা মূল্যে রাতযাপনের ব্যবস্থা এবং সৈকতে বসে ইফতারের সুযোগ চালু করা যেতে পারে।’ তাঁর মতে, এসব সুবিধা চালু হলে রমজানেও পর্যটকেরা কক্সবাজার আসবেন।

সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ইফতারের বিস্তার

সৈকতের লাবণি, সুগন্ধা, কলাতলী পয়েন্ট ছাড়াও হিমছড়ি, সোনারপাড়া, ইনানী, পাটোয়ারটেক ও টেকনাফ সৈকতে ইফতারের আয়োজন দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৪০-৫০টি দল বালিয়াড়িতে ইফতার করতে ছুটে আসছেন, শুক্র-শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যা বেড়ে দুই গুণ হয়। পর্যটক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় লোকজন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরাও এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ঢাকা থেকে আসা কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘পাহাড় আর সাগরের মিলনস্থলে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার সেরে নেওয়ার সুযোগ দেশের আর কোথাও নেই।’

রোজার মাসে কক্সবাজার শহরের তিন শতাধিক রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় পর্যটকদের কিছুটা বিড়ম্বনা হয়, কিন্তু হোটেল-রিসোর্টের বিশেষ উদ্যোগ ও সৈকতের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ ইফতারের এই নতুন প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু ধর্মীয় আনন্দই নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার একটি অনন্য মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।