‘জিলহজ’ শব্দের অর্থ হজের মাস। ইসলামি বর্ষপঞ্জির এই মাসটি হজের প্রধান মাস হিসেবে পরিচিত। জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত পাঁচ দিনে হজের মূল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হজ সম্পাদন সুবিদিত মাসসমূহে (শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ)। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে (ইহরামের নিয়ত করে), তার জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়। তোমরা উত্তম কাজ যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয়র ব্যবস্থা করো; নিশ্চয়ই তাকওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানী ব্যক্তিগণ, তোমরা আমাকে ভয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
জিলহজ মাসের আগাম প্রস্তুতি
জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার আগে নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, চুল কাটা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি করবে, তারা যেন (এই ১০ দিন) চুল ও নখ না কাটে।’ (মুসলিম: ৫২৩৩; ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা: ২২৭)
আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘আমাকে আজহার দিন (১০ জিলহজ) ঈদ পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আল্লাহ এই উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন।’ এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি বলুন, যদি আমার কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য না থাকে, কিন্তু আমার কাছে এমন উট বা বকরি থাকে, যার দুধ পান করা বা মাল বহনের জন্য তা প্রতিপালন করি—আমি কি তা কোরবানি করতে পারি?’ তিনি বললেন, ‘না। বরং তুমি তোমার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ কেটে ফেলো এবং নাভির নিচের চুল পরিষ্কার করো। আল্লাহর নিকট এটাই তোমার কোরবানি।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, ত্বহাবী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা: ৩০৫)
জিলহজ মাসের আমল
জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দিনে রোজা পালন করা এবং রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা সুন্নত। যেমন: নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ, তওবা-ইস্তিগফার ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিলহজের ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্যান্য দিনের ইবাদতের তুলনায় অধিক প্রিয়। প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য, আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমতুল্য।’ (তিরমিজি, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা: ১৫৮)
আরাফার দিনের রোজা
আরাফার দিন, অর্থাৎ ৯ জিলহজ রোজা রাখা বিশেষ সুন্নত আমল। তবে আরাফায় অবস্থানরত হাজিদের জন্য এই রোজা প্রযোজ্য নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী যে আল্লাহ–তাআলা তার (রোজাদারের) বিগত এক বছরের ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা: ১৫৭)
তাকবির পাঠ
জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার তাকবির বলা ওয়াজিব। পুরুষেরা স্বাভাবিক (উচ্চ) স্বরে এবং মহিলারা নিম্ন স্বরে তাকবির বলবেন। তাকবির হলো ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ (ইলাউস সুনান, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা: ১৪৮)
কোরবানির বিধান
জিলহজের ১০, ১১ ও ১২—এই যেকোনো দিনে কোনো ব্যক্তির মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা ব্যবসার পণ্য থাকলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। পুরুষ ও মহিলা—সবার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য। (ইবনে মাজাহ: ২২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! এই কোরবানি কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ তাঁরা আবার বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব রয়েছে।’ তাঁরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! ভেড়ার লোমের কী হুকুম?’ (এটা তো গণনা করা সম্ভব নয়)। তিনি বললেন, ‘ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে সওয়াব রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৬)
নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৬)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম



